Sunday 14 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রমেকে রোগীর মৃত্যু / ১০ বার কান ধরে ওঠবস, তারপর মিলল মায়ের লাশ

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৪ জুন ২০২৬ ১১:৫৩ | আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ ১২:৫১

মৃত নুরজাহান বেগমের ছেলে রিফাত হাসান।

রংপুর: রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে অক্সিজেন সংকটকে কেন্দ্র করে এক রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসক ও স্বজনদের মধ্যে সংঘর্ষের এক অভিনব নাটকের অবতারণা হয়েছে। মৃত্যুর জন্য একে অপরকে দায়ী করে পালটা-পালটি অভিযোগের মধ্যেই চিকিৎসকরা প্রায় ১১ ঘণ্টা লাশ আটকে রেখে বিক্ষোভ করেন এবং অবশেষে মৃতের ছেলেকে ‘কান ধরে ওঠবস’ করানোর শর্তে মরদেহ ফেরত দেন। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী, হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (১২ জুন) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে রংপুর নগরীর নিউ জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দা নুরজাহান বেগম (৫৫) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার ছেলে রিফাত হোসেন তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে নিয়ে যান।

বিজ্ঞাপন

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালে নেওয়ার পর রোগীর শ্বাসকষ্ট প্রকট হয়ে উঠলে স্বজনরা দায়িত্বরত চিকিৎসকদের কাছে অক্সিজেন দেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেন। স্বজনদের অভিযোগ, জরুরি ভিত্তিতে অক্সিজেন দেওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকরা প্রথমে ভর্তির সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দেন। এই দেরির কারণে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং রাত প্রায় ৪টার দিকে নুরজাহান বেগমের মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর খবরে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন স্বজনরা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুর পরই তার ছেলে রিফাত ও অন্য স্বজনরা কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. রাকিবুল হাসান, ইন্টার্ন চিকিৎসক নাঈমসহ তিন চিকিৎসকের ওপর হামলা চালান এবং তাদের মারধর করেন। হামলার ঘটনায় একজন নার্সের সঙ্গেও অশোভন আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার (১৩ জুন) সকাল থেকে পরিস্থিতি পুরোপুরি থমকে যায়। চিকিৎসক ও ইন্টার্নরা হাসপাতালের মর্গের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা হামলাকারী ছেলে রিফাতকে শাস্তির দাবিতে লাশ ফেরত না দেওয়ার ঘোষণা দেন। এ সময় সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রায় তিন ঘণ্টা জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ রেখে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেন তারা।

লাশ ফেরতের শর্ত ‘ওঠবস’

দীর্ঘ সময় ধরে লাশ আটকে রাখা হলে স্বজনরা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তারা লাশ ফেরতের দাবিতে হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন, যা এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি করে।

হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আশিকুর রহমান ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ ফেরত দিতে চিকিৎসকদের অনুরোধ করলেও কর্ণপাত করেননি আন্দোলনকারীরা। অবশেষে ১১ ঘণ্টা পর, বিকেল ৩টার দিকে, চিকিৎসকদের দাবির মুখে পড়ে রিফাত হোসেনকে হাসপাতালে আসতে হয়। তাকে হাসপাতাল পরিচালকের কার্যালয়ের একটি কক্ষে নিয়ে ১০ বার ‘কান ধরে ওঠবস’ করানো হয়। এই শাস্তি ভোগ করার পরই তার মায়ের লাশ হস্তান্তর করা হয়, যা তিনি দাফনের জন্য নিয়ে যান।

পরিচালক যদিও ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনাকে ‘অত্যন্ত নিন্দনীয়’ বললেও তিনি দাবি করেন, ‘উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বার্থেই লাশ মর্গে রাখা হয়েছিল।’

এই অভিনব শাস্তির ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও অধিকারকর্মীরা লাশ আটকে রেখে শাস্তি আদায়ের এই ঘটনাকে ‘অমানবিক ও জুলুম’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। মৃতের ভাগনে আব্দুস সালাম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা বারবার আকুতি করেছি আগে দাফন করি, তারপর ছেলেকে এনে ক্ষমা চাইয়ে দেবো। কিন্তু চিকিৎসকরা মানেননি। শেষমেশ উপায় না পেয়ে ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে লাশ নিয়ে যেতে হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে জুলুম।’

অন্যদিকে, স্বজনরা হামলার ঘটনা অস্বীকার করে বলছেন, শুধু বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। তারা দাবি করেন, চিকিৎসকদের অবহেলা থাকায় ছেলেটি উত্তেজিত হয়েছিল। তবে হাসপাতালের পরিচালক আশিকুর রহমান দাবি করেছেন, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে চিকিৎসকদের গাফিলতি পাওয়া যায়নি; বরং চিকিৎসক ও নার্সের ওপর হামলার প্রমাণ মিলেছে।

এ ঘটনায় এখনও পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ উপস্থিত ছিল। রোগীর স্বজনরা জানিয়েছেন, তারা অক্সিজেন সংকটের ঘটনায় হাইকোর্টের সাহায্য নিতে পারেন। এই ঘটনা চিকিৎসা সেবায় রোগীর অধিকার, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর