গাইবান্ধা: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম যুদ্ধাহত নারী মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা গাইবান্ধার রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি আর নেই। দীর্ঘদিন বার্ধক্য ও নানা শারীরিক জটিলতায় শয্যাশায়ী থাকার পর বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
সাদুল্লাপুর উপজেলা সদরের উত্তরপাড়া গ্রামের ফুলমতি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হন। তখন তার বয়স ছিল আনুমানিক ২৮ বছর। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৪৫ বছর স্বীকৃতির বাইরে থাকার পর ২০১৬ সালের মার্চে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান তিনি।
২০১৭ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে তার জন্য চার কক্ষবিশিষ্ট ‘বীর নিবাস’ নির্মাণ করে দেওয়া হয়। জীবনের শেষ সময়ে সেখানেই শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি। প্যারালাইসিস, ব্রেন স্ট্রোকসহ নানা জটিলতায় তার চলাফেরার সক্ষমতা হারিয়ে যায়। নিজ বাড়িতেই চলছিল তার চিকিৎসা।
ফুলমতির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তার ছেলে মনিরাজ কুমার। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে মায়ের শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ও স্যালাইন দেওয়া হচ্ছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর তাঁর অবস্থার অবনতি হলে তিনি মারা যান।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় নিজ বাড়িতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ফুলমতির স্বামী কুশিরাম সরকার ফসিয়া ১৯৮৮ সালে মারা যান। এরপর পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে একাই সংসারের দায়িত্ব সামলান তিনি। পরবর্তীতে এক ছেলে ও এক মেয়ের মৃত্যু হয়। অভাব-অনটনের সংসারে সন্তানদের নিয়ে দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন কাটিয়েছেন এই বীরাঙ্গনা।
সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, ‘শেষ জীবনে ফুলমতি নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি। তার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।’
ফুলমতির মৃত্যুতে মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংবাদিক, শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ফুলমতি শুধু একজন নারী নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।