Thursday 08 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মৌসুম শেষেও জমজমাট আমের বাজার, দিনে কোটি টাকার বেচাকেনা

মো. আশরাফুল ইসলাম, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৮ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:২৮ | আপডেট: ৮ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:৩৮

গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া এলাকার বারোমাসি আমের বিশেষ বাজার।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ: ‘আমের রাজধানী’ চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার মৌসুমের গণ্ডি পেরিয়ে সারা বছর আমের বেচাকেনার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া এলাকায় কৃষকদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বারোমাসি আমের বিশেষ বাজার। স্থানীয়দের দাবি, এটি দেশের প্রথম বারোমাসি আমের বাজার। প্রতিদিন এখানে গড়ে প্রায় কোটি টাকার আম কেনাবেচা হচ্ছে।

বাজারটি স্থানীয়ভাবে ‘কাটিমন আমের বাজার’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগানি, কৃষক, পাইকার, ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের আনাগোনায় সরগরম থাকে বাজার। মৌসুমি আমের বাজার শেষ হয়ে গেলেও এখানে এখনো নিয়মিত কাঁচা-পাকা বারোমাসি আম বিক্রি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, ভোলাহাট ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে অসংখ্য আমবাগান। ফজলি, ল্যাংড়া, ক্ষীরসাপাত, গোপালভোগসহ নানা জাতের আমের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই দেশজুড়ে পরিচিত এ জেলা। বিশেষ করে শিবগঞ্জের কানসাট আমবাজার দেশের অন্যতম বৃহৎ আমের পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত।


গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া এলাকার বারোমাসি আমের বিশেষ বাজার।

তবে মৌসুমি আমের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে বছরের কয়েক মাসই কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মূল আয় হতো। মৌসুম শেষ হলে কমে যেত আমের বেচাকেনা। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন সময়ে ফলন কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক লোকসানের মুখেও পড়েছেন।

এ অবস্থায় পুরোনো আমগাছের পরিবর্তে কেউ কেউ বারোমাসি ও নাবি জাতের আমের চাষ শুরু করেন। এর মধ্যে থাইল্যান্ডের কাটিমনসহ বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের আম চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে ফলন পাওয়ার সুযোগ থাকায় এসব জাত কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

কৃষকের উদ্যোগেই বাজারের বিস্তার

গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া এলাকায় কয়েক বছর আগে অল্প কয়েকজন কৃষক বারোমাসি আম নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিক্রি শুরু করেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বাগান ও উৎপাদন। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যাও। একপর্যায়ে নিয়মিত বাজারে রূপ নেয় স্থানটি।

সম্প্রতি বোয়ালিয়া বাজারে গিয়ে দেখা যায়, আমগাছের নিচে সারি সারি ভ্যান। কোথাও কাঁচাপাকা কাটিমন আম, কোথাও আবার সম্পূর্ণ পাকা আম সাজিয়ে রেখেছেন বিক্রেতারা। বাগান থেকে আম এনে বাজারে বিক্রির জন্য অপেক্ষা করছেন কৃষকরা। ক্রেতারাও এক ভ্যান থেকে অন্য ভ্যানে ঘুরে আমের মান যাচাই ও দরদাম করছেন।

চৌডালা এলাকার কৃষক ওলিউল ইসলাম নিজের বাগানের আম নিয়ে বাজারে এসেছিলেন। তিনি বলেন, কয়েক বছর মৌসুমি আম চাষ করে লোকসানের মুখে পড়ার পর পুরোনো আমগাছ কেটে কাটিমন আম চাষ শুরু করেন। এখন কয়েক বছর ধরে এই বাজারেই আম বিক্রি করছেন।

ওলিউল ইসলাম বলেন, বারোমাসি আমের উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে। তবে উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় চলতি বছর গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রতি মণ আমের দাম দেড় থেকে দুই হাজার টাকা কম পাওয়া যাচ্ছে।

মৌসুম ছাড়াই চলছে ব্যবসা

বোয়ালিয়া বাজারে কথা হয় ভ্রাম্যমাণ আম ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। আগে তিনি মৌসুমি আমের সময় কানসাট বাজার থেকে আম কিনে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করতেন। মৌসুম শেষ হলে আমের ব্যবসাও বন্ধ হয়ে যেত।

শফিকুল ইসলাম বলেন, এখন বারোমাসি আমের কারণে বছরের অধিকাংশ সময় ব্যবসা করার সুযোগ হচ্ছে। আগে কানসাট বাজার থেকে আম কিনলেও এখন বোয়ালিয়া বাজার থেকেই আম সংগ্রহ করছেন।

তবে বাজারটির যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, বাজারটি এখনো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তেমন পরিচিত নয়। সড়ক প্রশস্ত করা এবং বাজারের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো গেলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি বাড়বে। এতে কৃষকরাও আমের ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

কানসাট থেকে বোয়ালিয়া বাজারে আম কিনতে আসা ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম জানান, তিনি নিয়মিত এখান থেকে আম কিনে অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার কারণে বারোমাসি আমের নতুন বাজার তৈরি হয়েছে।

বদলে যাচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতির চিত্র

বারোমাসি আমের চাষকে ঘিরে শুধু কৃষকরাই লাভবান হচ্ছেন না, এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন ভ্যানচালক, পরিবহন শ্রমিক, পাইকার, আড়তদার ও অনলাইন উদ্যোক্তারা। মৌসুমের বাইরেও আমের বাজার সচল থাকায় এসব মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়ছে।

তবে ব্যবসায়ীদের মতে, বাজারটির সামনে এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরু সড়ক, পর্যাপ্ত বাজার অবকাঠামোর অভাব, সংরক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং দেশব্যাপী পরিচিতির ঘাটতির কারণে সম্ভাবনার তুলনায় বেচাকেনা এখনো সীমিত। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা, সংরক্ষণ ও পরিবহন সুবিধা বাড়ানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া হলে এর পরিধি আরও বাড়তে পারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের ঐতিহ্য এতদিন মূলত কয়েক মাসের মৌসুমি আমকে ঘিরেই ছিল। এখন কৃষকদের উদ্যোগ ও বারোমাসি আম চাষের ফলে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। মৌসুম শেষ হওয়ার পরও বোয়ালিয়া বাজারে আমের বেচাকেনা চলমান থাকা সেই পরিবর্তনেরই একটি উদাহরণ।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা গেলে বোয়ালিয়া দেশের গুরুত্বপূর্ণ বারোমাসি আমের বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এতে ‘আমের রাজধানী’ চাঁপাইনবাবগঞ্জের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হবে সারা বছর আম উৎপাদন ও বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা।

বারোমাসি আম চাষ ও বোয়ালিয়া বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি।

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর