জোসনা জামান, স্টাফ করসপনডেন্ট
ঢাকা: বন্যাপ্রবণ ও নদীভাঙ্গন এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে ৪২৩টি আশ্রয় কেন্দ্র। এগুলো নির্মিত হলে দুর্যোগ কালীন সময়ে বিপদাপন্ন মানুষ ও তাদের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ এবং প্রাণী সম্পদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া অন্য সময় আশ্রয় কেন্দ্রগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উন্নত পরিবেশ দেওয়া যাবে। এ জন্য বন্যা ‘প্রবণ ও নদীভাঙ্গন এলাকায় বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ১ হাজার ৫০৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) আগামী সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন হতে পারে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে। অনুমোদন পেলে চলতি মাস থেকে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য এ এন সামসুদ্দিন আজাদ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর প্রস্তাবিত বন্যাপ্রবণ ও নদীভাঙ্গন এলাকায় বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় দেশের ৭টি বিভাগের ৪২টি জেলার ২৪৭টি উপজেলায় ৪২৩টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মিত হবে। ফলে বন্যাপ্রবণ ও নদীভাঙ্গন এলাকায় দুর্যোগকালীন সময়ে আক্রান্ত মানুষের জীবন, প্রাণী সম্পদ ও অন্যান্য সম্পদের আশ্রয় ও সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া প্রকল্পভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী করা এবং প্রকল্প এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ছাত্র-ছাত্রীদের উন্নত পরিবেশে শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ জরুরি সাড়াদান ও সুরক্ষার মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষতিকর প্রভাব সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। অধিক জনসংখ্যার ঘনত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান, গ্রীস্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় বেসিনে অবস্থান এবং সক্রিয় বর্ষাকালে অতি বৃষ্টি দুর্যোগপ্রবণতার মূল কারণ। বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে গ্রীস্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প ও বড় মাত্রার ঘূর্ণিঝড় নিয়মিতভাবে দেখা দেয়। প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রায় ২৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার অর্থাৎ ১৮ শতাংশ ভূখণ্ড বন্যা কবলিত হয়। ব্যাপকভাবে বন্যা হলে দেশের ৫৫ শতাংশের অধিক ভূখণ্ড বন্যার প্রকোপে পড়ে। প্রতি বছর গড়ে বাংলাদেশে তিনটি প্রধান নদীপথে মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আদ্র মৌসুমে ৮৪৪ মিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি প্রবাহিত হয়। বৃষ্টির কারণে দেশের অভ্যন্তরে ১৮৭ মিলিয়ন কিউবিক মিটার নদী প্রবাহ সৃষ্টি হয়। বর্ষাকালে নদী, খাল, বিল, হাওর ও নিচু এলাকা ছাড়িয়ে সমস্ত জনপদ পানিতে ভেসে যায় এবং ফসল, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সহায়-সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করে।
এ ছাড়া প্রতি বছর এ দেশের লাখ লাখ মানুষ নদীভাঙ্গনের শিকার হয়। মাঠের শস্য, ক্ষেত ও বসতভিটার ভূমি নদীভাঙ্গনের মাধ্যমে বিলীন হয়ে যায়। বাংলাদেশের সর্বমোট প্লাবণভূমির প্রায় ৫ শতাংশ ভূমি প্রত্যক্ষভাবে নদীভাঙ্গনের কবলে পড়ছে। দেশের ৪৯৬টি উপজেলা বা থানার মধ্যে ৯৪টি উপজেলায় নদীভাঙ্গনের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৯৩ সালের জুন মাসে দেশের ১৬টি জেলার নদীভাঙ্গনের ফলে ২৫ হাজারের বেশি পরিবার গৃহহীন হয়। বর্ষা মৌসুমে তীর ছাপিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়া, তীরভাঙ্গন এবং তীর রেখার পরিবর্তন খুবই সাধারণ চিত্র।
বন্যা প্রবণ ও নদীভাঙ্গন এলাকায় বিপদাপন্ন মানুষের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, জীবন, প্রাণী সম্পদ ও অন্যান্য সম্পদেও সুরক্ষার জন্য সরকারি-বেসরকারি ও বিভিন্ন সংস্থা এ পর্যন্ত ২ হাজার ৪৮৭টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও অধিদপ্তর ২০০৪ সাল থেকে ২০০৬ অর্থ বছরে ২৫টি আশ্রয় কেন্দ্র এবং প্রথম পর্যায় প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ১০৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০৮-১০ অর্থবছরে ৭৪টি, দ্বিতীয় পর্যায় প্রকল্পের আওতায় ১৬ হাজার ৫২৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৩ থেকে ২০১৭ অর্থ বছরে ১৫৬টিসহ মোট ২৫৫টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ জন্য প্রকল্পটির তৃতীয় পর্যায় বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
যেসব জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে সেগুলো হলো- রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর এবং দিনাজপুর জেলা। রাজশাহী বিভাগের বগুড়া, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, রাজশাহী এবং সিরাজগঞ্জ। ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ঢাকা এবং গাজীপুর। ময়মনসিংহ বিভাগের কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর এবং নেত্রকোণা। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ এবং সিলেট। খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, নড়াইল, এবং সাতক্ষীরা জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।
সারাবাংলা/জেজে/ এসআই