।। ওমর ফারুক হিরু, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট।।
কক্সবাজার: কক্সবাজারের নাজিরারটেক শুঁটকিপল্লীর শুঁটকি দেশ ছাড়িয়ে রপ্তানি হয় বিদেশে। এই পল্লীর মহালগুলোতে কাজ করেন প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক, যার মধ্যে ১৫ হাজারই নারী। কক্সবাজারের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই ব্যবসা। এতে নারীদের প্রধান ভূমিকা থাকলেও, বছরের পর বছর তারা বেতন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুঁটকি মহালে কাজ করে একজন পুরুষ শ্রমিক পান পাঁচশ থেকে সাতশ টাকা। একই সময় কাজ করে একজন নারী শ্রমিক পান মাত্র দুইশ থেকে আড়াইশ টাকা। যা পুরুষের বেতনের তুলনায় অর্ধেক।

দীর্ঘদিন এই বৈষম্য চলতে থাকলেও মালিকদের বিরুদ্ধে কথা বলার কেউ নেই। নারীরাও চাকরি হারানোর ভয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পান না। এর আগে বেতন বৈষম্যের বিষয়ে কথা বলতে গেলে অনেক শ্রমিককে কর্মক্ষেত্র থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। কাজ হারালে তাদের খাবার বন্ধ হয়ে যাবে এ ভয়ে কেউ কোনো কথা বলেন না।
এই নারী শ্রমিকরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। তারা জানেেই না ‘মে দিবস’ কী? নাজিরারটেক শুঁটকিপল্লীতে কর্মরত নারীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
স্থানীয় আক্তার হোসেনের শুঁটকিপল্লীতে কাজ করেন হাসিনা আক্তার। দুই বছরের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে গত দু’বছর ধরে এই শুঁটকিপল্লীতে কাজ করছেন তিনি।

হাসিনা আক্তার বলেন, ‘তিন বছর আগে স্বামী শাহাব উদ্দিন তাকে ছেড়ে অন্য একজনকে বিয়ে করেন। সেই থেকে এই পেশা বেছে নিই। ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত শুঁটকি মহালে মাছ বাছাই ও ধোয়াসহ নানা কাজ করি। সারা দিন কাজ করে বেতন পায় আড়াইশ টাকা। আমার মতো আরও ১১ জন নারী শ্রমিক এই মহালে কাজ করেন। তারাও একই বেতন পান।’
অথচ একই মহালে কর্মরত লিয়াকত মিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা যায় সারাদিন কাজ করে ৫০০ টাকা বেতন পান তিনি। বেতনের এমন পার্থক্য কেন ? এমন প্রশ্নের উত্তরে হাসিনা আক্তার বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই এই বেতনে কাজ করে আসছি। আমাদেরকে এর বেশি দেওয়া হয় না। আর এটিই এখানকার নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে’।

বেতন বৈষম্য নিয়ে কেন কথা বলছেন না- এমন প্রশ্নের উত্তরে শ্রমিক হালিমা আক্তার বলেন, ‘প্রতিবাদ করে লাভ নেই, বরং ক্ষতি। প্রতিবাদ করলে চাকরি চলে যাবে। তখন আমার চার সন্তানকে খাওয়াবে কে? যেদিন বেতন বাড়ানোর কথা বলা হবে তার পর দিন থেকে কাজে না আসার কথা বলে দেবে মালিক। তাই এসব বলে লাভ নেই।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী শ্রমিক জানান, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদ-বৃষ্টিতে কাজ করি। তবুও মহাল মালিকদের মন গলে না। বেতন বাড়ায় না। শুঁটকি মহালের সব মালিকেরা ঐক্যবদ্ধ। তারা সিন্ডিকেট করেই নারীদের বেতন কম দেয়। শুঁটকি মহালে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের কম বেতন দিতে পারলে মালিকদের লাভ বেশি। কেউ কখনও প্রতিবাদ করে সুবিধা করতে পারেনি। যারা প্রতিবাদ করেছে তাদের কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেকে মারধরের শিকার হয়েছেন।

সবাই এক সাথে কেন প্রতিবাদ করেন না এমন প্রশ্নের উত্তরে বৃদ্ধা নারী শ্রমিক ছফুরা খাতুন জানান, এখানে নারী শ্রমিকের অভাব নেই। দেশি শ্রমিকদের সাথে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা নারী শ্রমিক। কেউ কাজ না করলে সেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার জায়গা পূরণ করে অন্যরা।
বেতন বৈষম্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে শুঁটকি মহাল মালিক নুরুল হাকিম জানান, ‘এটি বৈষম্য না। নারীরা দুর্বল। তারা পুরুষদের মত কাজ করতে পারে না। তাই তাদের বেতন কম দেওয়া হয়। সব মহাল মালিকেরা নারীদের বেতন দেন দুইশ থেকে তিনশ টাকা। আর পুরুষদের দেন পাঁচশ থেকে সাতশ টাকা।
নারীদের বেতন বৈষম্যের ব্যাপারে নাজিরার টেক মৎস্য ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আতিক উল্লাহ জানান, নারীদের কাজ পুরুষদের কাজের তুলনায় অনেক সহজ। নারীরা মাছ বাছাই, ধোয়া আর সামান্য বহনের কাজ করে। পুরুষেরা নৌকা থেকে মাছ নামানো, পরিবহনে তোলাসহ নানা ভারি কাজ করে থাকে। তাই তাদের বাড়তি বেতন দেওয়া হয়।
কক্সবাজার জেলা হোটেল শ্রমিক লীগের সভাপতি রুহুল কাদের মানিক জানান, নাজিরারটেক শুঁটকিপল্লীর নারী শ্রমিকেরা এখন মে দিবস সর্ম্পকে জানে না। এই দিনেও তারা কাজ করছেন। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।
সারাবাংলা/আইএ/এমও