।। রিপন আনসারী, ডিস্টিক্ট করেসপন্ডেন্ট ।।
মানিকগঞ্জ: মানিকগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলের গৃহিণীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছে মুড়ি তৈরির কাজে। রমজান মাস শুরু হওয়ার সাথে সাথে তাদের এই ব্যস্ততা বেড়েছে কয়েকগুণ। গৃহিণীদের হাতে ভাজা স্বাদে ভরপুর ও সুগন্ধ এই মুড়ি কদর সারা বছরের চাইতে রমজানে অনেক বেশি। বিশেষ করে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার নবগ্রাম, ধলাই, উপাজানি ও সরুপাই গ্রামের গৃহবধূরা পরম মমতা দিয়ে এই মুড়ি তৈরি করছে।
সরেজমিনে মানিকগঞ্জ-হরিররমাপুর সড়ক সংলগ্ন ধলাই গ্রামে দেখা যায়, রোকেয়া বেগমের বাড়িতে হাতে ভাজা ভুষিভাঙ্গা মুড়ির গন্ধ। পরিবারের সবাই ব্যস্ত মুড়ি তৈরির কাজে। প্রথম রমজানের আগে থেকে প্রতিদিন তারা দুই থেকে তিন মণ মুড়ি মাটির চুলোয় ভেজে বিক্রি করছে। পাইকাররা এখান থেকে মুড়ি ক্রয় করে জেলা শহরের বড় বড় দোকানে নিয়ে বিক্রি করে থাকেন। এছাড়া এই অঞ্চলের সুস্বাদু মুড়ির কদর বেশি। এ কারণে জেলার গণ্ডি পেরিয়ে তা চলে যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। শুধু রোকেয়া বেগমের বাড়িতেই নয় এই গ্রামের আরো ১০-১৫টি বাড়িতে চলছে মুড়ি তৈরির ধুম।
রোকেয়া বলেন, স্বামীর সংসারে যেদিন পা রেখেছি সেদিন থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি মুড়ি তৈরিতে। প্রায় ৩০ বছরের অধিক সময় ধরেই মিশে আছি মুড়ি ভাজার কাজে। আমার বাড়ির হাতে ভাজা মুড়ির নাম ডাক অনেক জায়গাতেই ছড়িয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, হাতে ভাজা মুড়ির কদর সব চাইতে বেশি থাকে রমজান মাসে। এই মাসে প্রতিদিনই পাইকাররা আমাদের কাছ থেকে মুড়ি কিনে তা শহরে বেশি দামে বিক্রি করে আসছে। আমরা যে মুড়ি তৈরি করি তাতে কোনও ধরনের ভেজাল নেই। নেই কোন রাসায়নিক ক্ষতিকর পদার্থ। যার কারণে হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বেশি। তবে সারা বছরের চেয়ে রোজার সময় এর চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। পাইকাররা আমাদের এখান থেকে প্রতি কেজি মুড়ি ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় কিনে নিয়ে যায়। তারা বিক্রি করে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে।
একই এলাকার মুড়ি তৈরির কারিগর তাহের আলী বলেন, মুড়ি তৈরি করি প্রায় ৪৫ বছর। কিন্ত এখন আর আগের মতো এ পেশায় লাভ নেই। স্বচ্ছলতা নেই সংসারেও। পুঁজি না থাকায় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া দামে ধান কিনতে হচ্ছে। শুধু তাই নয় কষ্টের মুড়ি অল্প দামে দিতে হয় তাদের। সরকার যদি আমাদের অল্প সুদে লোন দিতো তাহলে নিজেরা ধান কিনে মুড়ি ভাজতে পাড়তাম। লাভও বেশি হতো। মহাজনরা বাজারে নিয়ে এক কেজি মুড়ি বিক্রি করে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি।
মুড়ি তৈরির কারিগর সাগর মিয়া জানান, ভুষিভাঙ্গা মুড়ির ধান আনতে হয় বরিশাল থেকে। সেখান থেকে প্রতি মণ ধান আনতে খরচ পড়ে ১৪৫০ টাকার ওপরে। এক মণ ধানে ২২ থেকে ২৪ কেজি মুড়ি হয়। রমজান মাসে হাতে ভাজা মুড়ির কদর বেশি থাকে।
গ্রামের সকিনা বেগম জানান, সারাবছরের চাইতে রমজান মাসে হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা থাকে অনেক বেশি। মুড়ি ভেজে শেষ করা যায় না। মাথার উপর পাইকাররা দাঁড়িয়ে থাকে। তবে বরিশাল থেকে চড়া দামে ধান কিনে আনার কারণে লাভ কম হয়।

মো. শাজানান মিয়া জানান, বাজারে মেশিনে তৈরি মুড়ির কারণে আমাদের মুড়ি উৎপাদন কমে গেছে। কারণ ওই সব মুড়ি প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় পাওয়া যায়। আর আমাদের কাছ থেকে এক কেজি মুড়ি কিনতে হলে কমপক্ষে ১১০ টাকা লাগে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. রশিদ জানান, এক সময় এই গ্রামগুলো মুড়ির গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রত্যেকটি বাড়িতে মুড়ি তৈরি করা হতো। কিন্ত বর্তমানে বাজারে আধুনিক মেশিন দিয়ে রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে মুড়ি উৎপাদন করায় এ অঞ্চলের মানুষ হাতে ভাজা মুড়ি তৈরিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য দিকে যাচ্ছে।
স্থানীয় নবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাকিব হোসেন ফরহাদ জানান, আগে চার গ্রামে ১০০ পরিবারের মুড়ি ভাজার কাজ করতো। এখন কমে হয়েছে ২০ থেকে ২৫টি পরিবার। এদের সরকারি সহযোগিতা দেওয়া হলে তারা ফিরে আসতো এই পেশায়।
সারাবাংলা/টিএম