Friday 28 Feb 2025
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

শিশুসাহিত্যের পাঠক অনেক, তবুও..

আহমেদ জামান শিমুল
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২৩:৫৮ | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০২:১৫

স্টলে সাজিয়ে রাখা শিশুদের বই। ছবি: শিমুল

১৮১৮ সালে ১৮টি উপদেশমূলক গল্প নিয়ে ‘নীতিকথা’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। স্কুলপাঠ্য হিসেবে লেখা হলেও এটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম শিশুপাঠ্য বই হিসেবে ধরা হয়। সে হিসেবে আমাদের শিশুসাহিত্যের বয়স দুই শতাব্দী পেরিয়েছে। সাহিত্যবিশারদদের মতে বর্তমানে বাংলা শিশুসাহিত্যের তৃতীয় পর্যায় চলছে।

প্রথম পর্যায় সীমাবদ্ধ ছিল বর্ণমালা চেনানো ও শেখানো। দ্বিতীয় পর্যায় ছিল গল্পের মাধ্যমে নীতি ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া। আর তৃতীয় পর্যায়ে এসে শিশুসাহিত্য হয়ে উঠেছে আনন্দময়। এ পর্যায়কে রবীন্দ্রযুগ বলেন অনেকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাশাপাশি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার, কাজী নজরুল ইসলাম, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়সহ অনেকেই বাংলা শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

শিশুসাহিত্যের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে গেল কয়েক বছর ধরেই অমর একুশে বইমেলায় রাখা হচ্ছে ‘শিশু চত্বর’। সেখানের পাশাপাশি পুরো মেলায় অনেক স্টলেই শিশুদের জন্য বই প্রকাশিত হচ্ছে। সে বইগুলো কতটুকু শিশুদের চাহিদা মেটাচ্ছে? নতুন শিশুসাহিত্যিকও কি উঠে আসছে? প্রশ্ন এসে যায়।

ছোট শিশুটি খুঁজছে তার পছন্দের বই। ছবি: শিমুল

উত্তরা থেকে নার্সারীর শিক্ষার্থী নুসাইবা রঙিন পাতার বই দেখছিল ‘পঙ্খিরাজ’-এর স্টলে। নুসাইবা সারাবাংলাকে জানাল, সে ছবি আঁকার বই খুঁজছে। পাশাপাশি তার পছন্দ ছড়ার বই। সে বললো, ‘আমার তো সবগুলো ছড়ার বই কিনতে ইচ্ছে করে। ছড়া পড়তে আমার খুব মজা লাগে। কিন্তু আব্বু-আম্মু তো সব কিনে দেয় না।’

বিজ্ঞাপন

মানহা এসেছিল লক্ষ্মীপুর থেকে তার বাবা-মার সঙ্গে। সে সারাবাংলাকে বলেছে, ‘যে সব বইয়ে রঙিন ফুল, পাখির ছবি রয়েছে সেগুলো পড়তে ভালো লাগে।’

কেনার আগে বইয়ের কয়টি পাতা পড়ে দেখছে শিশুটি। ছবি: শিমুল

অনেক অভিভাবককে দেখা গেলে শিশু চত্বর কিংবা মেলার অন্যান্য স্টলে শিশুদের নিয়ে ঘুরলেও বই কিনে দিতে চান না। তবে নিজেদের বই কেনার আগে বাচ্চাদের জন্য বই আগে কিনছেন এমন অভিভাবকেরও দেখা মিলেছে। তাদেরই একজন ফাহিম মুনতাসির। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগে বইমেলায় আসলে নিজের জন্য বই কিনতাম। এখান সবার আগে বাচ্চাদের স্টলে যাই। আমাদের সন্তানের জন্য নানারকম বই কিনে নিয়ে যাই। আমি চাই আমার বাচ্চার পৃথিবী পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না হোক।’

বিশাল এক পাঠক শ্রেণী থাকা সত্ত্বে এবার শিশুসাহিত্যের বই খুবই নগন্য পরিমাণে এসেছে। এর কারণ কী? ‘দোলন’-এর প্রকাশক কামাল মুস্তাফা সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা এ বছর ৭-৮টির মত নতুন বই প্রকাশ করেছি। আর আমাদের স্টলটি এমন এক জায়গায় বাংলা একাডেমি দিয়েছে—এ জায়গায় লোকজন তেমন একটা আসে না। বইমেলাতেও এবার লোকজন কম, যার কারণে বেচা-বিক্রির অবস্থা খুবই খারাপ। এ কারণে হয়তো বই প্রকাশের সংখ্যাও কম।’ মন্দার মধ্যেও শিশুদের গল্পের বই তার স্টলে বেশি বিক্রি হয়েছে বলে জানালেন।

বাবা-মার কোলে চড়ে বহু শিশু এসেছিল মেলায়। ছবি: শিমুল

দেশে শিশুসাহিত্যিক কমে যাচ্ছে দাবি করে কামাল মুস্তাফা সারাবাংলাকে বলেন, ‘বেশিরভাগ শিশুসাহিত্যিক এখন আর শিশুদের জন্য লিখতে চান না। দেখা যাচ্ছে কেউ শিশুদের জন্য ছড়া লিখতো, উনি হয়তো বড়দের জন্য উপন্যাস লিখছেন। এতে করে ভালো শিশুসাহিত্যিকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আমার পত্র-পত্রিকায় শিশুদের জন্য লেখা গল্প, কবিতা, ছড়া সে হারে ছাপা হচ্ছে না। যার কারণে নতুন পাঠকও তৈরি হচ্ছে না।’

জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক পলাশ মাহবুবের মতে শিশুসাহিত্যের পাঠক খুব না বাড়লেও আশঙ্কাজনক হারে কমেছে তাও না। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘এটা বলতে পারেন স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। এটা এমন না যে তা হতাশজনক। আমি যেটা প্রত্যাশা করি, এটা বাড়ার দরকার। শুধু শিশুসাহিত্য না যে কোনো বইয়ের বিক্রি আরও বাড়া দরকার। আমাদের শিক্ষার হার বাড়ছে, জীবনমানও বাড়ছে, সবকিছুর হার যদি পজেটিভ থাকে—সেক্ষেত্রে তো মানুষের বই পড়া উচিত।’

শিশুসাহিত্যিক মাসুম আওয়ালের মতে, শিশুসাহিত্যের পাঠক কখনই কমে না। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শিশুরা আসছে। শিশুদের নিয়ে বৈচিত্র্যময় লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। শিশুসাহিত্যিক, প্রকাশক বাড়ছে। একই সঙ্গে এর পাঠকও বাড়ছে।’

অনেক অভিভাবক সন্তানদের জন্য বই কিনে নিয়েছেন। ছবি: শিমুল

তিনি আরও বলেন, ‘খেয়াল করলে দেখবেন শিশুরা শুধু ছড়া বা গল্পের বইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তারা অ্যাডভেঞ্চার, ভূতের গল্পের প্রতিও আগ্রহী হচ্ছে।’ একই কথা জানালেন ‘ছোটদের সময়’-এর প্রকাশক মামুন সারওয়ার। তিনি সারাবাংলাকে জানান, তার স্টলে ভূতের গল্পের বই প্রচুর বিক্রি হয়েছে।

শিশুসাহিত্যকে সাহিত্যের একটি বিশেষায়িত শাখা হিসেবে ধরা হয়। এর জন্য শিশুসাহিত্যিককে বেশ কিছু বিষয় মাথায় রেখে লিখতে হয়। এটা অনেক সাহিত্যিক পারেন না বলে কিছু প্রকাশক বলছেন। এ ব্যাপারে পলাশ মাহবুব বলেন, ‘আমি যেহেতু বড় ও ছোট সবার জন্য লিখি, তাই আমাকে কতগুলো বিষয় মাথায় রাখতে হয়। এর মধ্যে শব্দ নির্বাচন, বাক্যের গঠন রয়েছে। শিশুদের জন্য খুব সহজবোধ্য শব্দ ব্যবহার করতে হয়। অনেক বড় বাক্য শিশুরা পড়তে কষ্ট হয়—সেটাও মাথায় রাখতে হয়। সে কারণে তাদের জন্য ছোট ছোট বাক্যে লিখতে হয়। আবার বর্তমানে অনেক বইয়ে ৫ বছর, ৭ বছর বাচ্চার উপযোগী লেখা থাকে। সেক্ষেত্রেও লেখককে অনেক বেশি সচেতন থাকতে হয়।’

শিশুরা পছন্দের বই খুঁজছে। ছবি: শিমুল

মুকুল, প্রকৃতি, সন্দেশ, মৌচাক, শিশুসাথী, খোকাখুকু, শুকতারার মত পত্রিকা শিশুসাহিত্যিক ও পাঠক তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে সাপ্তাহিক একটি পাতা বরাদ্দ থাকতো শিশুদের জন্য। সেখানে তাদের উপযোগী নানারকম লেখা প্রকাশিত হত। বর্তমানে সে পাতাও বিলুপ্ত হয়েছে। এত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও শিশুসাহিত্যের আরও বিকাশ সম্ভব বলে মনে করেন লেখক-প্রকাশকরা।

‘অনেক বাবা-মা পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্য বই পড়তে দেন না তাদের শিশুদের। কিন্তু মনের বিকাশের জন্য তাদের উচিত শিশুদের বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে দেওয়া। এতে করে শিশুসাহিত্য যেমন আরও বিকশিত হবে, তেমনি শিশুদের মননও সমৃদ্ধ হবে’,— বলেন মাসুম আওয়াল।

বছরে শুধু ফেব্রুয়ারিতে বইমেলার মধ্যে বই কেনা, পড়া সীমাবদ্ধ না রেখে বাড়ানোর কথা বললেন প্রকাশকরা। তারা বলেন, শুধু ফেব্রুয়ারিতে না, সারাবছরই বই নিয়ে নানা ধরনের আয়োজন থাকতে হবে। তাহলে অন্যান্য সাহিত্যের পাশাপাশি আমাদের শিশুসাহিত্যেরও লেখক-পাঠক দুটো বাড়বে।

পলাশ মাহবুব বলেন, ‘আমাদের এখানে আগে একটা আন্তর্জাতিক বইমেলা হত। সেটা আবার শুরু করা দরকার। এতে করে আমাদের পাঠকরা বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে যেমন জানবে, আমরাও জানবো। বিশ্বের সেরা শিশুসাহিত্যগুলো বাংলায় অনুবাদ করা উচিত। আমাদের দেশের সাহিত্যিকদের বইও বিশ্বদরবারে পৌঁছাতে ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করা উচিত।’

সারাবাংলা/এজেডএস

বইমেলা ২০২৫ শিশুসাহিত্য

বিজ্ঞাপন

শিশুসাহিত্যের পাঠক অনেক, তবুও..
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২৩:৫৮

আরো

সম্পর্কিত খবর