Wednesday 21 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ক্লাবফুট বা মুগুর পা: সময়মতো চিকিৎসায় বদলে যায় ভবিষ্যৎ

সুমিত বণিক
২১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৫৫

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪,০০০ শিশু জন্ম নেয় মুগুর পা বা ‘ক্লাবফুট’ নিয়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি জন্মগত ত্রুটি, যেখানে শিশুর এক বা উভয় পা ভেতরের দিকে বাঁকানো থাকে। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটি কেবল একটি শারীরিক সমস্যাতেই সীমাবদ্ধ নেই; এর সাথে জড়িয়ে আছে গভীর সামাজিক কুসংস্কার, ভীতি আর ভুল ধারণা। সঠিক চিকিৎসা না পেলে এই শিশুরা স্বাভাবিক হাঁটাচলা থেকে বঞ্চিত হয়, যা তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অথচ বাস্তবতা হলো—সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসায় আর দশটা স্বাভাবিক শিশুর মতোই তারা দৌড়াতে পারে, খেলতে পারে এবং মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মুগুর পা বা ক্লাবফুট সম্পূর্ণ জন্মগত একটি অবস্থা। আমাদের সমাজে অনেক পরিবার এখনো একে ‘অভিশাপ’ বা ‘ঐশ্বরিক শাস্তি’ বলে মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। এটি মূলত জেনেটিক বা জিনগত কারণে হওয়া একটি সমস্যা, যা সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। বাংলাদেশে সচেতনতার অভাবে এবং কুসংস্কারের বেড়াজালে পড়ে অনেক শিশুই সঠিক সময়ে চিকিৎসা পায় না। বছরের পর বছর বিনা চিকিৎসায় থাকার ফলে তারা যেমন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়, তেমনি সামাজিকভাবেও হয়ে পড়ে কোণঠাসা।

গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসা না করালে এই শিশুদের হাঁটাচলা, দৌড়ানো এমনকি স্কুলে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোকলজ্জার ভয়ে অনেক পরিবার এই বিষয়টি গোপন রাখেন কিংবা শহরের হাসপাতালে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য বা সাহস পান না। ফলে একটি শিশু ও তার পরিবার আজীবন এক অমানবিক চক্রে বন্দি হয়ে পড়ে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ২০০৯ সাল থেকে ‘ওয়াক ফর লাইফ’ কর্মসূচির মাধ্যমে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। গ্লেনকো ফাউন্ডেশনের হাত ধরে শুরু হওয়া এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘মিরাকলফিট’-এর সহযোগিতায় এটি আজ একটি জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো—দেশের প্রতিটি প্রান্তে নামমাত্র মূল্যে এবং টেকসই উপায়ে এই শিশুদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা।

এই চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয় বিশ্বস্বীকৃত ‘পনসেটি মেথড’। এটি সম্পূর্ণ কাটাছেঁড়া বা সার্জারিবিহীন একটি পদ্ধতি, যেখানে ধারাবাহিক প্লাস্টার, সামান্য শিরা শিথিলকরণ (টেনোটমি) এবং বিশেষ জুতা বা ব্রেস ব্যবহারের মাধ্যমে পা সোজা করা হয়। গবেষণায় প্রমাণিত যে, বাংলাদেশে এই পদ্ধতিতে ৯৯ শতাংশেরও বেশি শিশু সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হাঁটার সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে এই কার্যক্রম পরিচালনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে ‘ইউনাইটেড পারপাস বাংলাদেশ’। তাদের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘মিরাকলফিট’। এই যৌথ উদ্যোগের ফলে এখন কেবল বড় শহর নয়, বরং দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকাতেও সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

এই কার্যক্রমের মূল শক্তি হলো ‘আর্লি ডিটেকশন’ বা জন্মের পরপরই দ্রুত শনাক্তকরণ। মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় ক্লিনিক এবং হাসপাতালগুলো এখন নবজাতকের পায়ের অবস্থা দেখেই দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে রেফার করছে। দক্ষ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে পনসেটি মেথডের প্রটোকল মেনে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে কেবল প্লাস্টার বা জুতা পরানোই শেষ কথা নয়; চিকিৎসার সুফল ধরে রাখতে পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের নিয়মিত কাউন্সেলিং করা হচ্ছে যাতে তারা ধৈর্য ধরে ব্রেস পরানোর নিয়ম মেনে চলেন। শুরু থেকে এ পর্যন্ত ‘ওয়াক ফর লাইফ’ কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশে ৩০,৫০০-এরও বেশি শিশু চিকিৎসা সেবা পেয়েছে এবং এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

মুগুর পায়ের চিকিৎসায় সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পনসেটি মেথড শুরু করা গেলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। দেরি হলে চিকিৎসা জটিল হতে পারে এবং পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। দুঃখজনকভাবে, সচেতনতার অভাবে বা কুসংস্কারের কারণে অনেক পরিবার শুরুতে কবিরাজি বা ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নেন, যা মূল্যবান সময় নষ্ট করে। এই বাধা দূর করতে প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবার সাথে ক্লাবফুট শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াকে একীভূত করা।

বাংলাদেশে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে মানুষের মনে গেঁথে থাকা ভ্রান্ত ধারণা ভাঙাটা সহজ নয়। ‘পাপের ফল’ বা ‘লজ্জার বিষয়’—এমন তকমা লাগিয়ে অনেক শিশুকে ঘরবন্দি করে রাখা হয়। ইউনাইটেড পারপাস বাংলাদেশ ও ওয়াক ফর লাইফ চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি এই মানসিকতা পরিবর্তনের জন্যও কাজ করছে।

চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ওঠা শিশুদের গল্পগুলোই এখানে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। যখন সমাজ দেখে যে, মুগুর পা নিয়ে জন্মানো শিশুটি এখন আর দশজনের মতোই স্বাভাবিকভাবে হাঁটছে, তখন তাদের ভুল ভাঙছে। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মশালা এবং ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষকে বোঝানো হচ্ছে যে—এটি কোনো অভিশাপ নয়, বরং সাধারণ একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা।

বাংলাদেশের ক্লাবফুট চিকিৎসা কার্যক্রম জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করেছে যে, সীমিত সম্পদের মধ্যেও সঠিক পরিকল্পনা, মানসম্মত চিকিৎসা এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। এই কার্যক্রমের ফলে কেবল শিশুদের পা সোজা হচ্ছে না, বরং তারা ফিরে পাচ্ছে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ, খেলায় অংশগ্রহণের আনন্দ এবং সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার।

তবে চ্যালেঞ্জ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানো, ব্রেস পরার নিয়ম শতভাগ মেনে চলা নিশ্চিত করা এবং কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করতে আমাদের আরও পথ পাড়ি দিতে হবে। নবজাতকের রুটিন চেকআপের অংশ হিসেবে মুগুর পা স্ক্রিনিং নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

মিরাকলফিট-এর সহায়তা এবং ইউনাইটেড পারপাস-এর বাস্তবায়নে বাংলাদেশ আজ এমন এক পথে হাঁটছে, যেখানে মুগুর পা আর কোনো জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে থাকবে না। প্রতিটি শিশু বেড়ে উঠবে বাধাহীন শৈশব নিয়ে। এটি কেবল একটি চিকিৎসা নয়—এটি মর্যাদা, অন্তর্ভুক্তি এবং নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন। আসুন, আমরা এই শিশুদের পাশে দাঁড়াই, তাদের দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যাবার আগামীর পথকে মসৃণ করি।

লেখক: জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক

সারাবাংলা/জিএস/এএসজি
বিজ্ঞাপন

পঞ্চগড়ে ই-বেইলবন্ড সিস্টেম চালু
২১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৩০

আরো

সম্পর্কিত খবর