উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক কখনো বড় সুযোগ তৈরি করে আবার কখনো তা নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামের চুক্তিতে সই করেছে বাংলাদেশ। প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি শুল্ক কমানোর চুক্তি বলে মনে হলেও বাস্তবে এটি কেবল বাণিজ্যের সীমায় আবদ্ধ নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৌশলগত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই চুক্তি কি সত্যিই বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য নতুন গতি তৈরি করবে, নাকি এর ভেতরে এমন কিছু শর্ত রয়েছে যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের নীতি স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক কৌশলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে?
আমাদের অর্থনীতিতে রপ্তানি খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় অংশই আসে রপ্তানি থেকে, যার মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প সবচেয়ে বড় অবদান রাখে। গত এক দশকে তৈরি পোশাক শিল্প শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিই হয়নি এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং শিল্পায়নের অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। এই শিল্পের প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে অবস্থান করছে। তবে বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ শুল্কের মুখোমুখি হয়। অনেক ক্ষেত্রে তৈরি পোশাকের ওপর ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়, যা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বড় একটি বাধা।
এই প্রেক্ষাপটে শুল্ক কমানোর সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের জন্য একটি আকর্ষণীয় সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তির মাধ্যমে কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক কমানোর সুবিধা পাওয়া গেছে। চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করেছে এবং প্রায় আড়াই হাজার বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত বা বিশেষ সুবিধায় মার্কিন বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। প্রথম দৃষ্টিতে এই সুবিধা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য ইতিবাচক বলে মনে হতে পারে। শুল্ক কমলে বাংলাদেশের পণ্য তুলনামূলক কম দামে মার্কিন বাজারে পৌঁছাতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় কিছুটা সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
কিন্তু এই চুক্তির আরেকটি দিক রয়েছে, যা অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর ৩২ পৃষ্ঠার যে চুক্তিপত্র প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যায় এটি শুধু শুল্ক কমানোর বিষয় নয়, এতে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, কৃষি এবং প্রযুক্তি খাতেও বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি ও শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পারস্পরিক বাজার উন্মুক্ত করা। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে প্রায় আড়াই হাজার বাংলাদেশি পণ্যের জন্য সুবিধা দিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ প্রায় ৪ হাজার ৪০০টি মার্কিন পণ্যের জন্য একই ধরনের সুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, গাড়ি ও যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পণ্য, গরুর মাংস, পোলট্রি, বাদাম ও ফল। এর ফলে বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন পণ্যের প্রবেশ আরও সহজ হবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একদিকে প্রযুক্তি ও আধুনিক পণ্যের প্রবেশ সহজ করতে পারে কিন্তু অন্যদিকে স্থানীয় শিল্পের ওপর প্রতিযোগিতার চাপও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে উন্নত দেশের ভর্তুকিপ্রাপ্ত পণ্য বাজারে প্রবেশ করলে স্থানীয় উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কাও অনেক অর্থনীতিবিদ প্রকাশ করেছেন।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য’ ধরনের প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন জ্বালানি— বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। এর ফলে ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাসের পরিবর্তে মার্কিন কোম্পানিই অগ্রাধিকার পাবে। কৃষিখাতেও বাংলাদেশ অন্তত ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য যেমন গম ও সয়াবিন আমদানি করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও গভীর করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্নও তৈরি করে— এই ধরনের বড় অঙ্কের আমদানি প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর কী প্রভাব ফেলবে। যদি আমদানি দ্রুত বাড়ে কিন্তু রপ্তানি সেই হারে না বাড়ে তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এর কৌশলগত শর্তগুলো। চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বেশি সামরিক সরঞ্জাম কেনার চেষ্টা করবে এবং কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে প্রতিরক্ষা ক্রয় কমাবে। যদিও সেখানে কোনো দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবে বিশ্লেষকদের মতে এটি মূলত চীনের দিকেই ইঙ্গিত করে। এছাড়া চুক্তির একটি ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না, যাদের যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। এর ফলে ভবিষ্যতে রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে পারমাণবিক জ্বালানি সহযোগিতার সম্ভাবনা সীমিত হয়ে যেতে পারে। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যদি বাংলাদেশ চীন বা রাশিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় ‘নন-মার্কেট দেশ’-এর সঙ্গে কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করে আবার শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারবে। এ ধরনের ধারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে খুবই সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয় কারণ এগুলো একটি দেশের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় এই ধরনের চুক্তি এটিই প্রথম, ফলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি— সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। অর্থনীতি ও বাণিজ্যেও এই ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য এবং অবকাঠামো উন্নয়নের বড় অংশীদার। আবার যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর একটি। এই দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। এই বাস্তবতায় নতুন বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করলেও নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্নও তুলে ধরে। অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করতে গিয়ে যেন দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বাধীনতা বা বহুমাত্রিক বাণিজ্য সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়— সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই নতুন বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ— দুটিই তৈরি করেছে। শুল্ক কমানোর ফলে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, বিনিয়োগ আকর্ষণ বাড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এই চুক্তির সঙ্গে যুক্ত কৌশলগত ও অর্থনৈতিক শর্তগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বাণিজ্যিক সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি দেশের নীতি স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তববাদী ও দূরদর্শী নীতির মাধ্যমে এই ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হলে এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। অন্যথায় এটি কেবল সাময়িক সুবিধা এনে দিলেও ভবিষ্যতে নতুন চাপ ও সীমাবদ্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট