বাংলাদেশ এক অপার সৌন্দর্যের দেশ। সবুজ শ্যামল প্রান্তর, নদীমাতৃক ভূখণ্ড আর প্রকৃতির এক অপার ভাণ্ডার। নদীমাতৃক এই দেশে উর্বর মাটি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ভেষজ উদ্ভিদের বৈচিত্র্য অসাধারণ। গ্রামীণ জীবনে যেমন ভেষজ উদ্ভিদ দৈনন্দিন চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, তেমনি আধুনিক গবেষণাতেও এগুলোর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ভেষজ উদ্ভিদ মানব সভ্যতার প্রাচীনকাল থেকেই চিকিৎসা, খাদ্য ও দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রকৃতির এই অমূল্য দান শুধু রোগ নিরাময়ে নয়, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক। আয়ুর্বেদ, ইউনানি, চীনা চিকিৎসা পদ্ধতি কিংবা লোকজ চিকিৎসায় ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।
বাংলাদেশে সর্বমোট ভেষজ উদ্ভিদের সংখ্যা কত তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আমাদের দেশে এ পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ভেষজ উদ্ভিদের সংখ্যা ৫৪৬টি উল্লেখ করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা বহুগুণ বেশি। কারণ আমাদের দেশে অধিকাংশ উদ্ভিদ ও লতাগুল্মেরই ভেষজ গুণ রয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য সবজি ও মসলাজাতীয় সবগুলো উদ্ভিদই উচ্চমাত্রার ভেষজ গুণসম্পন্ন। ভেষজ উদ্ভিদের চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থানীয় কৃষকদের জন্য আয়ের নতুন উৎস হতে পারে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে স্বাস্থ্য উপকারের জন্য ব্যবহৃত ভেষজ উদ্ভিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য থানকুনি, তুলসী, কালোমেঘ, বাসক, সর্পগন্ধা, অর্জন, হরিতকি, আমলকি, বহেরা, ঘৃত কুমারী, তেলাকুচা, নিম, উলঠকম্বল, মেহেদি, হলুদ, রসুন, আদা, বাসক, অ্যালোভেরা, দারুচিনি, ল্যাভেন্ডার ইত্যাদি।
ভেষজ গাছ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য উপকারিতা প্রদান করে। প্রাচীনকাল থেকে ভেষজ গাছের ব্যবহার ঔষধ হিসেবে চলে আসছে। এগুলো প্রাকৃতিকভাবে শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তুলসি সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিরাময়,নিম,ত্বকের সমস্যা ও ইনফেকশন দূর করতে, অশ্বগন্ধা মানসিক চাপ কমাতে ও শক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়ক। হলুদ, প্রদাহনাশক ও ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। ভেষজ গাছের নিয়মিত ব্যবহার স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর কী পরিমাণ ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয় তার কোনো সঠিক তথ্য নেই। তবে দেশে বর্তমানে প্রায় ৩ শতাধিক ইউনানী ও ২ শতাধিক আয়ুর্বেদিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়াও রয়েছে বহু ভেষজ প্রসাধনী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। ভেষজ ওষুধ ও প্রসাধন সামগ্রী তৈরির কাঁচামালের চাহিদা কেবল এসব প্রতিষ্ঠানে বছরে ২০ হাজার টনেরও বেশি। বাংলাদেশে প্রতি বছর সাড়ে ৩০০ থেকে পৌনে ৪০০ কোটি টাকার ভেষজ সামগ্রী আমদানি করা হয়। এগুলো সাধারণত ভেষজ ওষুধ ও প্রসাধন সামগ্রী তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ওষুধ ও ভেষজ প্রসাধনী তৈরির কারখানা অনেক বেড়েছে, আর সঙ্গতকারণে ভেষজের চাহিদাও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া শহরে এবং গ্রামের হাট বাজারে বিক্রি হয় অনেক ভেষজ উদ্ভিদ। বাংলাদেশের কবিরাজি চিকিৎসা, টোটকা ও উপজাতি এবং আদিবাসী সম্প্রদায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহার করে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার হিসাব মতে, বর্তমানে সারা বিশ্বে ভেষজ উদ্ভিদের ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার রয়েছে। প্রতি বছর এই চাহিদা ১০.১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। বর্তমানে এই বিশাল বাজারের অধিকাংশই ভারত ও চীনের দখলে।
ভেষজ উদ্ভিদের প্রধান আমদানিকারক দেশগুলো হল- যুক্তরাষ্ট্র, , কানাডা, অস্ট্রেলিয়া জাপান, মালয়েশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। এ ছাড়াও সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, আবুধাবি, কোরিয়া, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ভেষজ উদ্ভিদের ব্যাপক ব্যবহার ও চাহিদা রয়েছে। অপরদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে ভেষজ ওষুধ ব্যবহার করছে। ভেষজ ওষুধ ব্যবহারকারী সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, আর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন বিশ্বব্যাপী বাড়ছে ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা। আমাদের দেশ থেকে বর্তমানে বহির্বিশ্বে যে পরিমাণ নিমচারা রপ্তানি হচ্ছে তা মোট চাহিদার ১ শতাংশেরও কম। ভেষজ উদ্ভিদ চাষ অন্য যে কোনো ফসল চাষের চেয়ে বহুগুণ বেশি লাভজনক এবং নিরাপদ। সমগ্র বিশ্বে ভেষজ উদ্ভিদের বিপুল চাহিদা রয়েছে।
ভেষজ উদ্ভিদ রপ্তানি করে চীন প্রতি বছর আয় করে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ভারত আয় করে ৬ বিলিয়ন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার আয় ২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শতভাগ রপ্তানি সম্ভাবনা ছাড়াও দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর ভেষজ চিকিৎসাসহ ত্বক ও চুলের যত্নে ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহারের চাহিদা পূরণে কৃষক তুলনামূলক অধিক লাভ করতে পারেন। অধিকাংশ ভেষজ উদ্ভিদের চাষ প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ। সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন খুবই কম একারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। গুল্মজাতীয় ভেষজ প্রায় বিনা পরিচর্যা ও বিনা খরচে উৎপাদন সম্ভব, অথচ এসব উদ্ভিদের বাজার দর বেশ চড়া।
নাটোরের আফজাল উদ্দিনের সফল উদ্যোগে ১৫টি গ্রামজুড়ে গড়ে উঠেছে দেশের একমাত্র ‘ঔষধি গ্রাম’।যাতে চাষ হয় ছয়শতাধিক ভেষজ উদ্ভিদ। প্রায় ৯ হাজার পরিবার এর সাথে যুক্ত।দেশে বিদেশে বিপুল চাহিদা থাকায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হয়। এভাবে প্রতিটি বিভাগে যদি একটি করে ‘ঔষধি গ্রাম’ গড়ে তোলা যায় তাতে কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে মানুষ উপকৃত হবে না বরং দেশ ও জাতি নিজেদের আত্ননির্ভর করার যুগোপযোগী সিদ্ধান্তে উপনিত হয়ে আমাদের দেশ কৃষি ক্ষেত্রে নব দিগন্তের সূচনা বয়ে আনতে পারে। তাছাড়া শহরগুলোতে এখন ছাদকৃষির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে আগের চেয়ে অনের বেড়েছে এটি যেমন সবুজ সতেজ কীটনাশক মুক্ত শাক সবজি ফলনের মাধ্যম ঠিক তেমনি ক্লান্ত বিকেলের অবসর সময় কাটনোর একটি উপযুক্ত উপায়। এই ছাদ কৃষিতে শাক সবজি ফলমূলের সাথে ভেষজ উদ্ভিদ লাগানো হলে এক ছাদে সকল চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা পাওয়া সম্ভব। অল্প পরিসরে সর্বাধিক কম পরিশ্রমে অধিক ভেষজগুণ সম্পূর্ণ উদ্ভিদ হতে পারে অসুখের প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যম বা ত্বক ও চুলের যত্নের সহজ ও নির্ভরযোগ্য সমাধান।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৯৫টি উদ্ভিদ প্রজাতি বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যার মধ্যে অনেক ভেষজ উদ্ভিদও রয়েছে। এদের মধ্যে কিছু স্থানীয় (endemic) প্রজাতি শুধুমাত্র বাংলাদেশেই পাওয়া যায় এবং সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। ন্যাশনাল হারবেরিয়াম ও অন্যান্য গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে বিপন্ন ভেষজ উদ্ভিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অশোক, অশ্বগন্ধা, বনলতা, বনকরলা, চন্দন, হরিতকি, বহেরা ইত্যাদি। এ সকল উদ্ভিদ সংরক্ষণ ও সংখ্যাবৃদ্ধিকরণে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী। ভেষজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ ও ব্যাপকহারে চাষাবাদের জন্য সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে পারে যেমন, জাতীয় পর্যায়ে দেশব্যাপী ভেষজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মসূচি পালন করা যেতে পারে। গবেষণা ও চাষাবাদ সম্প্রসারণ করনের নিমিত্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সচেতন করা সহ রপ্তানি ও বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কৃষককে অধিক মুনাফা অর্জনের নিশ্চায়তা প্রদান করা হলে কৃষক ভেষজ উদ্ভিদ চাষে অধিক মনোযোগী হবে। ভেষজ উদ্ভিদ কেবল মানুষেরই উপকার করে তা নয় এটি মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বিকল্প হতে পারে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা সহ গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে ভেষজ উদ্ভিদ হতে পারে এক অপার সম্ভাবনার নাম।
লেখক: কর্মকর্তা, কৃষি তথ্য কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল