সমগ্র মুসলিম বিশ্বে পালিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা যার অপর নাম কোরবানির ঈদ। কোরবানি এমন একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান যা প্রত্যেকটি বড় বড় ধর্মেই আমরা দেখতে পাই। আমরা জানি, কোরবানির ঈদের প্রকৃত আনন্দ ত্যাগের মাধ্যমে। কিন্তু কী সেই ত্যাগ? কীসের ত্যাগ? এটা জানতে হলে, কোরবানি মূল তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে প্রথমে কোরবানি শব্দটির অর্থ নিয়ে ভাবতে হবে। কোরবানি শব্দটি এসেছে ‘কুরব’ ধাতু থেকে। যার অর্থ সান্নিধ্য, নৈকট্য ইত্যাদি। সুফিবাদী দর্শনে ‘কুরবিয়াত’ শব্দটি এই অর্থে প্রচলিত আছে যে, আল্লাহর কুরবিয়াত হাসিল করা অর্থাৎ আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করা। বর্তমানে আমাদের সমাজে কোরবানি যে রূপে দেখতে পাই সেটা হচ্ছে মূলত পশু কোরবানির প্রথা। এই পশু উৎসর্গ করা, বলি দেওয়া বা কোরবানি করা এটা হচ্ছে একটি প্রতীকী অনুষ্ঠান যা কোরবানির মূল তাৎপর্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করে। যদি আমরা প্রতীকী এই অনুষ্ঠানটাকেই কোরবানি বলে মনে করে থাকি তবে এই আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে এর মূল তাৎপর্যটাই অর্থহীন হয়ে যাবে।
আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্তির জন্য আল্লাহ মুমিনের কাছ থেকে কোরবানি দাবি করেন। অর্থাৎ আল্লাহ চান বান্দা ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে তার সান্নিধ্য অর্জন করুক। একজন মানুষ যখন আরেকজন মানুষের জন্য কোনরকম ত্যাগ স্বীকার করে, তখন এই দুই জন মানুষ একে অপরের সান্নিধ্য লাভ করে, একে অপরের নৈকট্য প্রাপ্ত হয়, একে অপরের মধ্যে দূরত্ব হ্রাস পায়। একজন অতিথিকে ভালোভাবে আপ্যায়ন করা একটা কোরবানি। এই আপ্যায়নের মাধ্যমেও অতিথির সঙ্গে গৃহকর্তার দূরত্ব হ্রাস পায় বা আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়, একে অপরের নৈকট্য প্রাপ্তি হয়। তাই আল্লাহও তার প্রিয় বান্দাদের পরীক্ষা হিসেবে তার প্রতি সমর্পণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বান্দার প্রিয় বস্তুটির কোরবানি চান। এই কোরবানি মূলত আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্তির জন্য, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
সকল ধর্মেই আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে কোরবানি দেওয়ার প্রচলন আছে। ইসলামে কোরবানির যে ধারণাটি আছে সেটি আমরা পেয়েছি জাতির পিতা ইব্রাহিম (আ.) এর মাধ্যমে। আল্লাহ ইব্রাহিমকে (আ.) প্রত্যাদেশ করেছিলেন যে, “তুমি তোমার প্রিয়বস্তু কোরবানি করো। অর্থাৎ প্রিয়বস্তু উৎসর্গ করো”। তিনি অনেক চিন্তা করে, আল্লাহর বারংবার প্রত্যাদেশের পরে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে তার ইহজগতে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু হচ্ছে বৃদ্ধ বয়সে তিনি যে সন্তান লাভ করেছেন, অর্থাৎ ইসমাইল (আ.)।
সেই পুত্র সন্তানটাই হচ্ছে তার প্রিয়বস্তু এবং আল্লাহ তাকেই উৎসর্গ করার জন্য আহ্বান করছেন। ইব্রাহিম (আ.) তার পুত্রকে নিয়ে কোরবানি দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হলেন। তিনি যখন তার পুত্রের গলায় ছুরি চালানোর জন্য প্রস্তুত হলেন, তখন আল্লাহ তার নিয়তকে কবুল করে নিলেন এবং তার পুত্রের বদলে প্রতীকীরূপে একটি পশু দুম্বা কোরবানি করার জন্য নির্দেশ দিলেন। সুতরাং বোঝা গেল, কোরবানি করার জন্য আল্লাহর চাওয়া ছিল সবচেয়ে প্রিয় বস্তু। ইব্রাহিম (আ.) এর এই আদর্শ অনুসারে আমাদেরও যদি কোরবানি করতে হয় প্রিয় বস্তুকেই প্রথমে কোরবানি করার জন্য নিয়ত করতে হবে। প্রতীকী পশুকে মূল কোরবানি হিসেবে মনে করলে সেটা হবে কোরবানির শিক্ষার বিপরীত অর্থাৎ আল্লাহ যে শিক্ষাটি দিতে চাইছিলেন, ইব্রাহিম (আ.) আমাদের সামনে যে শিক্ষাটি স্থাপন করলেন সেই শিক্ষাটি অর্থহীন হয়ে যাবে, শিক্ষাটি হারিয়ে যাবে, মূল্যহীন হয়ে যাবে।
বর্তমানে ইব্রাহিম (আ.) এর থেকে প্রচলিত সেই কোরবানি আল্লাহর রাসুল (সা.) এর সময় পর্যন্ত এবং আল্লাহর রাসুল (সা.) এর পর থেকে এখন পর্যন্ত চলে আসছে। তবে এর মধ্যে অনেক বিধিবিধানের পরিবর্তন এসেছে। যেমন আল্লাহর রাসুল (সা.) এর সময় কোরবানির যে বিধানটি দেওয়া হলো সেটা ছিল ১০ই জিলহজ অর্থাৎ হজের সময় হাজিরা হজের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কোরবানির মাধ্যমে হজের সমাপ্তি করতেন। কারণ তখনকার হজ বর্তমানের মতো ছিল না। সেই সময় হজ থেকে ফিরতে মানুষের কয়েক মাস সময় লেগে যেত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যখন মুসলিমরা হজে যেতেন এখনকার মতো এত উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা তখন ছিল না, বিমান ছিল না, গাড়ি ছিল না। সেই সময় কোরবানির ওই পশুর যে গোশত সেটা ফেরার পথে হাজিরা আহার নিবারণে, ক্ষুধা নিবারণে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতেন। তারা আহার করতেন। যার ফলে হজের শেষে এই কোরবানিটি ব্যবহারিকভাবেও খুব প্রয়োজনীয় ছিল।
আর হাজীদের কোরবানির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করার জন্য যারা হজ করতে পারতেন না তারাও তাদের নিজ নিজ এলাকায় কোরবানি করতেন। এই কোরবানির প্রচলন পূর্ব থেকে দিনে হানিফে অর্থাৎ ইব্রাহিম (আ.) এর দীনে থাকলেও আল্লাহর রাসুল (সা.) মক্কা জীবনে কখনো হাজীদের সঙ্গে পশু কোরবানি করেননি। কারণ, তখন কোরবানি করার মতো আনন্দকর পরিবেশ মক্কায় বজায় ছিল না। মক্কা জীবনে রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তার আসহাবরা ছিলেন নির্যাতিত একটি জাতি, যাদের হাতে কোনো সার্বভৌম ক্ষমতা ছিল না, কোনো রাষ্ট্রশক্তি ছিল না। অর্থাৎ তারা স্বাধীন ছিলেন না। কোরবানি হচ্ছে একটি জাতীয় ইবাদত, যা স্বাধীন মানুষের জন্য। তাই মক্কী জীবনে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কোরবানির কোনো ইতিহাস আমরা পাই না। তিনি যখন মদিনাতে হিজরত করলেন তারপর থেকে মক্কায় কাফির-মুশরিকরা যখন হজ করত সেই হজের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবীরা ১০ই জিলহজে কোরবানি করতেন, যদিও তারা হজে যেতেন না।
পাঠক, এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) যতদিন না তাওহীদ অর্থাৎ আল্লাহর সত্য দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন ততদিন কিন্তু তিনি পশু কোরবানি করেননি। ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরও পালন করেননি। কারণ এগুলো হচ্ছে একটি স্বাধীন জাতির জন্য প্রযোজ্য। আজ আমাদের মুসলিম জাতির অবস্থা কী? পুরো মুসলিম জাতি আল্লাহর তাওহীদ থেকে বিচ্যুত। আল্লাহর দ্বীন আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত নেই। আমরা পাশ্চাত্যের তৈরি করা, ব্রিটিশ ইহুদি-খ্রিষ্টানদের তৈরি করা জীবন বিধান দিয়ে আমাদের সমাজ, আমাদের দেশ পরিচালনা করি। আমাদের জাতীয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামষ্টিক জীবনের সমস্ত পর্যায়ে আমরা আল্লাহর হুকুমকে অস্বীকার করে তাদের হুকুমকে মেনে নিয়েছি এবং কয়েকশো বছর আগেই আমরা পাশ্চাত্যের পদানত হয়েছি। তাদের দ্বারা সামরিকভাবে পরাজিত হয়েছি। তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নিয়মকানুন দিয়ে আমরা জীবন পরিচালনা করছি। অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীনকে আমরা মানছি না। আল্লাহর প্রেরিত জীবনব্যবস্থা দিয়ে আমরা আমাদের জীবন পরিচালনা করছি না। বরং আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি।
প্রশ্ন হলো- এভাবে তাওহীদ থেকে সরে গিয়ে, আল্লাহর দ্বীনকে প্রত্যাখ্যান করে যতই ইবাদত-বন্দেগী, পশু কোরবানি, যা কিছুই করা হোক না কেন এগুলো কি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে? সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অর্থাৎ তাওহীদকে স্বীকৃতি না দিলে অন্য কোনো আমলই গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রকৃতপক্ষে মুসলিম বলে দাবীদার এই জাতির এখন প্রধান কর্তব্য হচ্ছে প্রথমে নিজেরা তাওহীদের সাক্ষ্য দেওয়া যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া জীবনের কোনো অঙ্গনে আর কারো হুকুম মানবো না। দ্বিতীয়ত আল্লাহর সেই হুকুমকে প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া। এই সংগ্রামে জানও কোরবানি দেওয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে, মালও কোরবানি দেওয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে। কাজী নজরুলের ভাষায়-
“খেয়ে খেয়ে গোশত রুটি তো খুব
হয়েছ খোদার খাসী বেকুব,
নিজেদের দাও কোরবানি।
বেঁচে যাবে তুমি, বাঁচিবে দীন,
দাস ইসলাম হবে স্বাধীন।”
এত গেল আমাদের অভ্যন্তরীণ অধঃপতন। এখন বলি দুইশো কোটি মুসলিম দাবিদার এই জনসংখ্যার বহির্বিশ্বের অবস্থা। বর্তমান দুনিয়ার এই দুইশো কোটি মুসলমানের মধ্যে সাড়ে ৮ কোটি কেবল উদ্বাস্তু। গত দুই দশকে এই জাতির অন্তত পঁচিশ লক্ষ মানুষ পরাশক্তিধর দেশগুলোর আগ্রাসনের শিকার হয়ে তাদের বোমা ও বুলেটের আঘাতে, তাদের রাসায়নিক অস্ত্রের বিষক্রিয়ায় নির্মম মৃত্যুবরণ করেছে। পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীরা অন্যায়ভাবে আক্রমণ করে মুসলিম দেশগুলো দখল করে নিচ্ছে, হত্যা ও নিপীড়ন চালাচ্ছে। তলোয়ার দিয়ে, বন্দুক দিয়ে, বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে, বাড়িঘরে আগুন দিয়ে নির্মমভাবে পৈশাচিক কায়দায় হত্যাকা- চালাচ্ছে। মুসলিম নারীদেরকে বন্দী করে ইউরোপ-আফ্রিকার বেশ্যালয়গুলোতে বিক্রি করে দিচ্ছে, ঘরে আটকে রেখে খ্রিষ্টানদের ঔরসজাত সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। আর শিশুগুলোকে রাসায়নিক বিষক্রিয়ার দ্বারা হত্যা করা হচ্ছে। মুসলিমরা মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইলেই, প্রতিবাদ করতে চাইলেই তাদের উপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে। যে জাতি একদিন ছিল সেরা জাতি, সেই জাতি এখন অন্য জাতির লাথি মার খেয়ে গোলামীর দিন যাপন করছে।
এই যখন সমগ্র দুনিয়ায় মুসলিম জাতির অবস্থা, এভাবেই যখন আমরা অন্য জাতির দ্বারা সামরিকভাবে পরাজিত, নিগৃহীত, তাদের তৈরি জীবনবিধান দিয়ে আমাদের সমাজজীবন পরিচালিত হচ্ছে, তখন জাতির মুক্তির জন্য সংগ্রাম না করে এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জীবন ও সম্পদ কোরবানি না করে ব্যক্তিগতভাবে যত ইবাদত-বন্দেগি আর পশু কোরবানি করা হোক, আমল করা হোক তা যে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না তা বোঝার জন্য মহাপ-িত হওয়ার দরকার পড়ে না, সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়। আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য আজ শুধু প্রতীকী কোরবানি নয়, সত্যিকারের জান-মালেরও কোরবানি করার সময় এসেছে।
লেখক: কলামিস্ট