Sunday 24 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

নারী-শিশু নির্যাতন বন্ধে কঠোর হতে হবে, নির্মূল করতে হবে মাদক-সন্ত্রাস

গোলাম সামদানী হেড অব নিউজ
২৪ মে ২০২৬ ২২:২৯

ঢাকা: দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে সন্ত্রাস, চাদাঁবাজি ও মাদকের ব্যবহার। সারা দেশের বিবেকবান মানুষ এ নিয়ে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সোহেলের বাসা থেকে শিশুটির রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধর করে পুলিশ। এ ঘটনায় শিশুটির পিতার আহাজারি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিষয়টি নিয়ে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। শিশুটির পিতার বক্তব্য কেবল মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়নি, বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে ব্যাপকমাত্রায় তুলে ধরে। তিনি বলেছেন, ‘আমি বিচার চাই না, আপনার বিচার করতে পারবেন না।’

বিজ্ঞাপন

তবে আশার কথা হলো, খুনি ও ধর্ষক সোহেলকে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। শুধু তাই নয় রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার মাত্র চার দিনেরর মধ্যে রোববার (২৪ মে) আদালতে পুলিশ চার্জশিট জমা দিয়েছে। চার্জশিটে প্রধান আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রামিসার বাসায় গিয়ে তার বাবা ও মাকে শান্তনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি একজন পিতা হিসেবে সহমর্মিতা জানাতে রামিসার বাসায় এসেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়।

তারেক রহমান শিশুটির পরিবারের প্রতি এই সহমর্মিতা বিচারের বিষয়ে বিপন্ন পরিবারটিকে আশস্থ করেছেন। সন্তান হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে রামিসার বাবা তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতিতে শান্তনা খোঁজার চেষ্টা করবেন। আর প্রধানমন্ত্রী রামিসার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে সমস্ত ভিকটিমের পরিবারের সদস্যদের একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর তা হলো সারাদেশে শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না, প্রধানমন্ত্রী তথা সরকার সারাদেশে ভিকটিম পরিবারগুলোর পাশে আছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই আন্তরিকতা বাংলাদেশের রাজনীতি বিরল। তবে প্রধানমন্ত্রীর এই আন্তরিকতার পাশাপাশি সারাদেশে সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজি, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে এখনই সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে দল-মত নির্বিশেষে প্রকৃত অপরাধীদের পাকড়াও করতে হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় করতে হবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের পুলিশ বাহিনী এখনো অনেকটাই নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। কিন্তু, পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই নীরবতা পালন করছে। তারা পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে যতটা সক্রিয় ছিল, বর্তমানে ততটাই নিষ্ক্রি অবস্থায় রয়েছে। এই অবস্থায় পুলিশের কোনো ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা, বিষযটি খতিয়ে দেখতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। একইসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করতে হবে। তাদের কাজকে কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে। যাতে কোনোভাবেই পুলিশ দায়িত্বে অবহেলা করতে না পারেন।

বাংলাদেশে নারী শিশু নির্যাতন নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তবর্তী সরকারের আমলে এই অপরাধের হার কিছুটা বাড়ে। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের বিগত তিন মাসেও তা অব্যাহত রয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় মব সৃষ্টি হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। আর এ ক্ষেত্রে কোনো ঘটনা ঘটার পর আসামি ধরতে পুলিশকে যতটা তৎপর হতে দেখা যায়, সন্ত্রাস বন্ধে পুলিশের ততটা তৎপরতা চোখে পড়ে না। এতে ধারণা হতে পারে, পুলিশ এখনো আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন না। এই অবস্থায় সেনাবাহিনীকে মাঠ থেকে তুলে নিলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে সেটাও ভাবতে হবে। আবার সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দীর্ঘদিন মাঠে রাখা এটাও ভালো দেখায় না। সব মিলিয়ে সরকারকে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এ ছাড়াও আমাদের মনে রাখতে হবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরাজিত শক্তি এখনো সক্রিয় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটানোর জন্য। অন্যদিকে নিযিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাকর্মীরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও তাদের লাখ লাখ নেতাকর্মী এখনো দেশে রয়েছে এবং থাকাটাও স্বাভাবিক। এ অবস্থায় কেবল রাজনৈতিক কারণে এবং সরকারকে বিবৃত করার জন্য তারা নানা ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে কিংবা সন্ত্রাসে জড়িয়ে রয়েছে কিনা সেদিকে নজর রাখতে হবে। সেই সঙ্গে বিরোধী দলের লোকজনও সরকারকে বিব্রত করার জন্য কিছু করছে কি না তাও ভাবতে হবে। তবে সব কিছুই সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে। অন্যথায় তাদের সমালোচনার মুখে পড়তে হবে।

এদিকে সমাজে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা, মাদকের ছড়াছড়ি, সামাজিক অবক্ষয়, শিক্ষার মানের অবনমনের কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে সরকারকে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সুস্থ বিনোদনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। কারণ, মাদকসেবীদের একটা অংশ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। সমাজে মাদক নির্মূল করা গেলে সামাজিক অপরাধ অনেকটা কমে যাবে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়াও খেলাধুলা-সাস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সুস্থ বিনোদনের অভাবের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হয়। এ সব বন্ধে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

কেবল ঘটনা ঘটার পর পুলিশ অল্প সময়ের মধ্যে অভিযুক্তকে পাকড়াও করছে, এটাকে যদি সরকার একমাত্র দায়িত্ব মনে করে তবে তা হবে আত্মঘাতী। কারণ, অপরাধ যাতে না ঘটে সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে। আর সেজন্য সরকারবে যা করতে হবে তা হলো- আইনশৃঙ্খলারবাহিনীর কঠোর অবস্থান ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত। দেশ মাদকের প্রসার কতটা ব্যাপক, পুলিশের অভিযানগুলো থেকে সহজে ধারণা করা যায়। ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, অপরাধীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ মাদকাসক্ত। বিএনপি সরকার গঠন করার পর মাদকবিরোধী কিছু অভিযান লক্ষ্য করা গেছে। মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা প্রায় সব সরকারকেই করতে দেখা যায়। কিন্তু, কখনোই দেশ থেকে মাদক দূর হয় না। মাদক নির্মূলে সরকারকে আর বেশি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। বিশেষ করে কীভাবে, কোন রুট দিয়ে মাদক দেশে প্রবেশ করে সেগুলো চিহ্নিত করে রুটগুলো বন্ধ করতে হবে।

এ ছাড়াও অনলাইন জুয়া একটা চিরস্থায়ী ব্যাধি হয়ে উঠেছে; বিশেষ করে নিম্ন আয়ের যুবকের মধ্যে এটা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এসব কারণে সমাজে অস্থিরতা বাড়ছে। সেজন্য মাদক ও জুয়া বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সাধারণ মানুষ চায় সরকার সন্ত্রাস কঠোরভাবে দমন করুক। সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই ধরনের সন্ত্রাস চলতে থাকলে সমাজে একধরনের হতাশা তৈরি হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীর অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। বলতে গেলে, নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে না এলে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন এত সহজ হতো না। এই নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিগত তিন মাসে নতুন সরকার বেশকিছু জনবান্ধব কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, যা জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত জীবনযাপনও মানুষকে ব্যাপকমাত্রায় আকৃষ্ট করছে। শক্ত হাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, সন্ত্রাস কঠোর হাতে দনণ করা না গেলে, নারী বিদ্বেষী বক্তব্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সরকারের এইসব অর্জন ধরে রাখা যাবে না।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, রাজনীতিতে মতভিন্নতা থাকবে, বিরোধ, বিরোধিতা ও প্রতিযোগিতা সবই থাকবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেশ ও দেশের জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। দেশ ও জনগণের স্বার্থে জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। অন্যথায় তারা নিজেরাই বিপদে পড়বে। দুঃখের বিষয় হলো- রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিরোধীদলগুলোকে গঠনমূলক দায়িত্ব পালন করতে দেখা যাচ্ছে না। বরং সরকারের সঠিক সমালোচনার পরিবর্তে ব্যক্তি চরিত্র হননের মতো দায়িত্বহীন ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে।

সারাবাংলা/জিএস/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

গোলাম সামদানী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর