Monday 19 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

নোবেল শান্তি পুরস্কার, ট্রাম্প ও নৈতিকতার প্রশ্ন

হাবিব বাবুল
১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:২৫

নোবেল শান্তি পুরস্কার কোনো অলংকার নয়, কোনো ব্যক্তিগত সম্পদও নয়— এটি একটি নৈতিক স্বীকৃতি, যা মানবতা, শান্তি, ন্যায়বিচার ও সহাবস্থানের পক্ষে অসাধারণ অবদানের প্রতীক। সেই পুরস্কারকে ঘিরে সাম্প্রতিক এক বিতর্ক আবারও প্রশ্ন তুলেছে— ক্ষমতা, ব্যক্তিপূজা আর রাজনৈতিক প্রচারণার যুগে নোবেলের মর্যাদা আমরা আদৌ কতটা বুঝি? ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো তার নোবেল শান্তি পুরস্কারের মেডেল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘উপহার’ দিয়েছেন— এই ঘোষণার পর নোবেল পিস সেন্টারকে স্পষ্ট করে বলতে হয়েছে, নোবেল পুরস্কার কখনোই হস্তান্তরযোগ্য নয়। মেডেল দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু পুরস্কার নয়। এই ব্যাখ্যাই আসলে আমাদের সামনে আরও গভীর একটি নৈতিক প্রশ্ন এনে দাঁড় করিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রথমত, নোবেল শান্তি পুরস্কারের দর্শন ও কাঠামোই বলে দেয়, এটি কোনো ব্যক্তিগত কৃতিত্বের ট্রফি নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়পর্বে নির্দিষ্ট কাজের স্বীকৃতি। একজন মানুষ তার জীবনের একটি অধ্যায়ে মানবকল্যাণে যে ভূমিকা রাখেন, নোবেল সেই ভূমিকাকেই স্বীকৃতি দেয়। ফলে কেউ যদি নিজের পাওয়া নোবেলকে অন্যের হাতে ‘উপহার’ হিসেবে তুলে দেন, সেটি প্রতীকী হতে পারে, কিন্তু নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় তা অর্থহীন। এর মধ্য দিয়ে বরং পুরস্কারের গভীরতা ও গুরুতর তাৎপর্যকে হালকা করে দেখার প্রবণতাই প্রকাশ পায়।

দ্বিতীয়ত, আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—অন্যের পাওয়া নোবেল শান্তি পুরস্কার বা তার মেডেল গ্রহণ করা কি কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য শোভন? বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশের প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন মানুষ যখন এমন একটি ‘উপহার’ গ্রহণ করেন বা সেটিকে প্রচারণার অংশ বানান, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত রুচির বিষয় থাকে না; এটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার প্রশ্ন হয়ে ওঠে। নোবেল শান্তি পুরস্কার কোনো দান বা উত্তরাধিকার নয় যে, তা গ্রহণ করলেই নিজের কৃতিত্বের ঝুলিতে যুক্ত হয়ে যাবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই বিতর্ক নতুন নয়। তিনি অতীতেও বহুবার প্রকাশ্যে বলেছেন যে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য, কিংবা অন্যরা পেয়েছে অথচ তিনি পাননি—এ নিয়ে তার আক্ষেপও গোপন নয়। কিন্তু নোবেল কমিটি কোনো আক্ষেপ বা জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় না। তারা দেখে কাজ, ফলাফল এবং তার স্থায়িত্ব। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সময় কিছু কূটনৈতিক উদ্যোগ থাকলেও, একই সময়ে তার বিভাজনমূলক বক্তব্য, অভিবাসন নীতি, জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবজ্ঞা—এসব বিষয় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। শান্তি কেবল যুদ্ধ থামানো নয়; শান্তি মানে ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা, সংলাপকে শক্তিশালী করা এবং দুর্বলদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—ট্রাম্পের নোবেল পাওয়া কি আদৌ কখনো সম্ভব? তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব নয়, কারণ নোবেল পুরস্কার ভবিষ্যতের কাজের জন্যও দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতায় নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে হলে যে নৈতিক উচ্চতা, ধারাবাহিকতা ও আত্মসংযম প্রয়োজন, তা এখনো তার রাজনৈতিক চরিত্রে স্পষ্ট নয়। বরং অন্যের পাওয়া পুরস্কারের প্রতীক গ্রহণ করার ঘটনা সেই ঘাটতিই আরও প্রকট করে তোলে। যে মানুষ নিজেকে নোবেলের যোগ্য মনে করেন, তার উচিত নিজের কাজ দিয়েই সেই যোগ্যতা প্রমাণ করা—অন্যের স্বীকৃতির ছায়ায় দাঁড়িয়ে নয়।

আরেকটি দিকও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নোবেল ফাউন্ডেশন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, পুরস্কার ঘোষণার পর তা প্রত্যাহার, ভাগ বা হস্তান্তরের কোনো সুযোগ নেই। এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও স্থায়ী। অর্থাৎ নোবেল কমিটি নিজেই তাদের রায়ের পেছনে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে একজন রাজনীতিক যদি সেই পুরস্কারকে ব্যক্তিগত ইচ্ছার বস্তু হিসেবে দেখেন, তবে সেটি নোবেলের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা হিসেবেই বিবেচিত হবে।

সবশেষে বলা যায়, নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা যদি অহংকারে, আত্মপ্রচারণায় বা অন্যের অর্জন নিজের বলে দাবি করার মানসিকতায় রূপ নেয়, তবে তা নোবেলের দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত। ট্রাম্পের নোবেল পাওয়া কখনোই সম্ভব নয়— এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে অন্যের পাওয়া নোবেল মেডেল গ্রহণের মতো ঘটনাগুলো তার সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করে না, বরং প্রশ্নবিদ্ধ করে। নোবেল শান্তি পুরস্কার ক্ষমতার নয়, মূল্যবোধের স্বীকৃতি। আর সেই মূল্যবোধ অর্জন করতে হয় নীরব, ধারাবাহিক ও মানবিক কর্মের মধ্য দিয়ে— উপহার গ্রহণের মাধ্যমে নয়।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর