গণমাধ্যমের মৌলিক চরিত্র হওয়া উচিত ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা—এটি শুধু একটি নৈতিক অবস্থান নয়, বরং আধুনিক সাংবাদিকতার অস্তিত্বের শর্ত। রাষ্ট্র, সরকার, করপোরেট শক্তি কিংবা যে কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর তোষামোদ করা গণমাধ্যমের কাজ নয়; বরং তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, সত্য উদ্ঘাটন করা এবং জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোই সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকতার এ নীতিগত অবস্থানের সুফল পায় বিরোধীদল। যেহেতু, সরকারের কার্যক্রমকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দায়িত্ব যুগপৎভাবে পালণ করে বিরোধীদল ও গণমাধ্যম। সেজন্য এই দুই গোষ্ঠী মূলত অভিন্ন লক্ষ্য তাড়া করে একটি সমান্তরাল রেখায় মিলিত হয়। গণমাধ্যম ও বিরোধীদল তাই অধিকাংশ সময় একে অন্যের কন্ঠস্বর হয়ে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে এক নৈতিক বন্ধুত্বও তৈরি হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিকতা গত এক/দেড় যুগ ধরে এক আচানক কিসিমের এথিকস দাঁড় করেছে। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার পরিবর্তে ক্ষমতার তোষামোদি করে তার নৈকট্য ও আস্থাশীলতা হাসিল করার মধ্যে সাংবাদিকতার সাফল্য খুঁজা হয়। সরকারের সমলোচনা নয়, বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ট্রল ও কূৎসা রটনা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য এবং অপমান-অপদস্ত করা বাংলাদেশের মিডিয়ার প্রধান কাজ। এতে প্রাপ্তিযোগ সরকারের ব্লেসিংস লাভ করা।
বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতার ইতিহাসে এ পর্যন্ত যত গৌরবের উপাখ্যান রচিত হয়েছে তার সিংহভাগই এন্টি ইনকামবেন্ট বা ক্ষমতাবিরোধী রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে। The Washington Post-এর সাংবাদিক Bob Woodward এবং Carl Bernstein ১৯৭০-এর দশকে Watergate Scandal উন্মোচনের রিপোর্ট বেদবাক্যের মত পড়ানো হয় আধুনিক সাংবাদিকতায়। তাদের ধারাবাহিক অনুসন্ধান তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট Richard Nixon-কে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলো।
The New York Times ১৯৭১ সালে Pentagon Papers প্রকাশ করে দেখিয়েছে কীভাবে সরকার ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছিলো।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমও অতীতে ক্ষমতার অগণতান্ত্রিক আচরণ ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে বহু যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। স্বৈরাচার এরশাদের পতন আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি গণমাধ্যম এক ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে দাড়িয়েছিলো জনগণের পাশে।
৯০ পরবর্তী গণতান্ত্রিক উত্তরণের পরও গণমাধ্যমের এ নৈতিক দায়বদ্ধতা চর্চিত হয়েছে কিছুকাল। পরবর্তীতে ক্ষমতাসীনরা দেখলো জনগণের পিঠে চাবুক চালানোর পথে সবচেয়ে বড় বাধা গণমাধ্যম। এদের বশে আনতে না পারলে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা কঠিন। এ উপলব্ধি কেবল বাংলাদেশে নয়, যুগে যুগে দুনিয়ার তাবৎ স্বৈরশাসকেরা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের প্রচারযন্ত্রের কাজে লাগিয়েছে।
Joseph Goebbels-এর নেতৃত্বে নাৎসি জার্মানিতে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করেছিলো জনমত প্রভাবিত করতে এবং রাষ্ট্রের অপরাধ আড়াল করতে। ইতিহাসে এটাকে গোয়েবলসীয় মিথ্যাচার নামে আজও স্মরণ করা হয়।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমকে সরকারি পিআর যন্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সবচেয়ে সফল কারিগর ছিলেন শেখ হাসিনা। হাসিনার ফ্যাসিজমকে দীর্ঘায়িত করতে এই নিয়ন্ত্রিত মিডিয়াই পাহারাদারের ভূমিকা পালন করেছে। অর্থ, পদ-পদবি আর সুযোগ-সুবিধার মুড়ি-চানাচুর ছিটিয়ে মতলববাজ মিডিয়াকর্মীদের বিপথগামী করেছিলো হাসিনা। এ অনৈতিক ভোগবাদের লোভে গা ভাসিয়েছিলেন সাংবাদিক গোষ্ঠীর একটি বড় অংশ।
এমনকি বহু জ্ঞানী-গুনী সাংবাদিক, যাদেরকে আমরা এথিকাল জার্নালিজমে গুরুজ্ঞান করতাম তারাও বিবেক বন্ধক দিয়ে হাসিনার বন্দনাগীতি চর্চায় প্রতিভা খাটিয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত মত হলো ১৭ বছরের ফ্যাসিজমে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মূল্যবোধ এবং সুশাসনের যে ধ্বংসলীলা চলেছে তার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছে গণমাধ্যমে।
পুরো গণমাধ্যম যেন তার চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে, যার রেশ এখনও ক্রীয়াশীল। সভ্য দুনিয়ায় গণমাধ্যম সরকারের ভুল পলিসি নিয়ে ক্রিটিকাল রিপোর্ট করে, আর বাংলাদেশের গণমাধ্যম মুখর থাকে বিরোধী দলের সমালোচনায়। বিরোধী দলের পেছনে লেগে মূলত সরকারের আশীর্বাদ কামানোর ধান্দায় ব্যস্ত থাকে গণমাধ্যম।
সেই যে ফ্যাসিস্টের ধরিয়ে দেয়া পি-আর জব কনসেপ্ট, তা গণমাধ্যমের মননে-মগজে এবং চরিত্রের সাথে মিশে গেছে। বিবেকের মুকুট হারিয়ে এরা এখন স্তাবকের জিঞ্জির গলায় পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ এক অদ্ভুত মিডিয়া বাংলাদেশে, যা নিজের কাঠামোগত চরিত্র হারিয়ে অপভ্রংশে রুপ নিয়েছে।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক