Tuesday 28 Apr 2026
সারাবাংলা: লেটেস্ট বাংলা খবর | ব্রেকিং নিউজ | Sarabangla.net

গবেষণায় ঘাটতি: টেকসই স্বনির্ভরতায় বাধা

রিয়াজুল হক
২৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:০৩

‎একটি রাষ্ট্র কতটা শক্তিশালী বা মর্যাদাপূর্ণ, তা নির্ভর করে সেই রাষ্ট্র জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখায় কতটা অবদান রাখছে। উদ্ভাবনী শক্তিতে কতটা স্বকীয়, সেটাই এখন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি। চিকিৎসা, কৃষি, সামরিক, মহাকাশ গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা শিল্প—প্রতিটি খাতের মেরুদণ্ড হলো গবেষণা। অথচ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ‘গবেষণা’ শব্দটি এখনো বিলাসিতা কিংবা একাডেমিক বাধ্যবাধকতার বৃত্তেই বন্দি হয়ে আছে। আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু রূঢ় সত্য হলো, আমাদের এখানেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি।

‎আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত ধারাটির দিকে তাকালে এক হতাশাজনক চিত্র ফুটে ওঠে। অনার্স বা মাস্টার্স শেষ করার পর আমাদের শিক্ষার্থীদের সিংহভাগের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় একটি ‘চাকরি’। বিশেষ করে সরকারি চাকরির প্রতি যে তীব্র মোহ, তা মেধাবী তরুণদের সৃজনশীলতাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করছে। চাকরি পাওয়া মাত্রই যেন জীবনের সব স্বপ্ন পূরণ হয়ে যায়। বাবা-মা বা অভিভাবকেরাও মনে করেন, সন্তানের একটা অবস্থান হবে যদি চাকরি হয়। কিন্তু এর ফলে একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর ভেতরকার যে উদ্ভাবনী সত্তা বা গবেষক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তা গতানুগতিক রুটিন কাজের চাপে পিষ্ট হয়। আমরা নতুন কিছু সৃষ্টি করার চেয়ে অন্যের সৃষ্টি করা ব্যবস্থাকে পরিচালনা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি।

বিজ্ঞাপন

‎প্রতি বছর আমাদের অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী উন্নত বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ডক্টরেট বা পোস্ট-ডক্টরেট সম্পন্ন করছেন। তাদের মেধা ও শ্রমে বিদেশের গবেষণাগারগুলো সমৃদ্ধ হচ্ছে, তারা আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাচ্ছেন। অথচ তাদের একটি বড় অংশই দেশে ফিরতে চান না বা ফিরতে পারছেন না। এর প্রধান কারণ ‘যোগ্যতার অবমূল্যায়ন’। একজন ডিগ্রিধারী গবেষক যখন দেশে ফিরে তার কাজের উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে, আর্থিক নিরাপত্তা না পেলে, বিদেশের মাটিতেই থেকে যেতে বাধ্য হন। এই ‘ব্রেইন ড্রেন’ বা মেধা পাচার আমাদের উন্নয়নকে টেকসই করার পথে বড় অন্তরায়।

‎বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন নতুন নতুন আবিষ্কারের নেশায় মত্ত, আমরা তখন অপেক্ষা করি, কবে সেই আবিষ্কৃত প্রযুক্তি বা পণ্য আমাদের বাজারে আসবে এবং আমরা তা ব্যবহার করতে পারব। এই পরনির্ভরশীল মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসা জরুরি। মনে রাখা প্রয়োজন, পৃথিবী কেবল তাদেরকেই সম্মান দেয়, যাদের কাছ থেকে পাওয়ার কিছু থাকে। আমরা যদি কেবল অন্য দেশের উদ্ভাবনের ভোক্তা হয়ে থাকি, তবে কোনোদিন প্রকৃত অর্থে আত্মনির্ভরশীল হতে পারব না।

‎দেশের সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ গবেষকদের যোগ্য সম্মান ও সুযোগ দিয়ে নিয়োগ দেওয়া যায়, তবে দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যাবে। গবেষণাকে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দেয়ালের তাত্ত্বিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, একে শিল্প ও উৎপাদনের সাথে যুক্ত করতে হবে।

‎গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো এবং গবেষকদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ ক্যারিয়ার তৈরি করা সময়ের দাবি। মেধাবীদের স্বপ্ন যদি কেবল একটি বিসিএস বা ব্যাংক জবে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে জাতি হিসেবে আমরা উদ্ভাবনী দৈন্যের শিকার হতেই থাকব। সময় এসেছে আত্মজিজ্ঞাসার—আমরা কি চিরকাল অন্যের আবিষ্কারের ক্রেতা হয়েই থাকব, নাকি নিজেদের জ্ঞান ও গবেষণার মাধ্যমে পৃথিবীকে নতুন কিছু উপহার দেব?

‎লেখক: অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক