Wednesday 28 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

আদালতে নিষিদ্ধ ‘উমেদার’, তবু থামছে না দাপট

তাহমিনা ইসলাম
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫:৩৫ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:২৬

ঢাকা: আদালত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন আদালতে আসেন হাজারো বিচারপ্রার্থী। কিন্তু সেই আদালত চত্বরেই যদি মামলার নথি দেখতে, নকল তুলতে কিংবা একটি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ‘বকশিশ’ দিতে হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি নিয়ে।

রাজধানীর অধস্তন আদালতগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ‘উমেদার’ নামে পরিচিত এক শ্রেণির বেসরকারি ব্যক্তি। আদালতের সরকারি কর্মচারী না হয়েও তারা নিয়মিত আদালতের বিভিন্ন কাজে যুক্ত। হাইকোর্টের নির্দেশনায় আদালতে উমেদারের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে সেই নির্দেশনা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বরং ঢাকার অধস্তন আদালতগুলোতেই ৫ শতাধিক উমেদার কাজ করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, তাদের কেউ কেউ মামলার নথি আনা-নেওয়া, নকল সরবরাহ, ওকালতনামা ও জামিননামা জমাসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত। এসব কাজের জন্য বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় ‘বকশিশ’। কোথাও কোথাও এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলার নথি চুরি কিংবা গায়েব করার ঘটনাও ঘটছে।

ঘুষ দিয়ে নথি, পরে উধাও

সম্প্রতি ঢাকার একটি মাদক মামলার নথি চুরির ঘটনায় উমেদারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভাটারা থানার ওই মামলার আসামি রবিউল হক মিয়ার মামলার নথি চুরির জন্য একটি চক্র ৫০ হাজার টাকা চুক্তি করে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ৩ আগস্ট আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেল ওরফে ‘মুরগি’ রাসেল মাস্ক পরে ঢাকার ৮ নম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যান। সেখানে কর্মরত উমেদার হিমেল ওরফে সাদ্দামকে ১ হাজার টাকা দেন তিনি। এরপর রবিউলের মামলার নথি দেখতে চান রাসেল।

অভিযোগ অনুযায়ী, উমেদার সাদ্দাম তার হাতে নথি তুলে দিলে তিনি সুযোগ বুঝে সেটি নিয়ে পালিয়ে যান। পরে আদালতের অফিস সহায়ক সুমন তালুকদার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। তবে নথি তুলে দেওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও উমেদার সাদ্দাম-কে ওই মামলায় আসামি করা হয়নি।

একই ধরনের ঘটনা ঘটে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতেও। খিলগাঁও থানার একটি অস্ত্র মামলার নথি চুরির জন্যও ৪০ হাজার টাকা চুক্তি হয়েছিল বলে জানা যায়। গত ২ জুলাই ‘মুরগি’ রাসেল ওই আদালতের উমেদার নাজমুল হাসান ওরফে রনি-কে ১ হাজার টাকা দিয়ে মামলার নথি নেন। পরে নথি নিয়ে পালিয়ে যান তিনি।

এ ঘটনায় আদালতের বেঞ্চ সহকারী খায়রুল আলম কোতোয়ালি থানায় মামলা করলেও উমেদার রনি-কে আসামি করা হয়নি।

নথি চুরির বাইরে মারধরের অভিযোগও

উমেদারদের বিরুদ্ধে শুধু নথি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ নয়, আদালতে প্রভাব বিস্তার ও মারধরের অভিযোগও রয়েছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর বিচারক শাহিদুল ইসলামের খাস কামরায় ঢাকা রেলওয়ে থানার এসআই মোহাম্মদ আলী-কে ডেকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগী পুলিশ কর্মকর্তার অভিযোগ, ওই আদালতের উমেদার শাহিন এ ঘটনায় অতি উৎসাহী হয়ে তাকে মারধর করেন।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দায়িত্ব পালনের সময় আদালতের অফিস সহায়ক সাকিব আল হাসানের ব্যাগ তল্লাশি করতে চাওয়াকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি ঘটে বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় বিচারককে আইন মন্ত্রণালয় থেকে শোকজ করা হলেও উমেদার সরকারি চাকরিজীবী না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

শুধু নথি নয়, জালিয়াতির অভিযোগও

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আদালতে উমেদারদের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতি বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি করছে। মামলার আদেশ ঘষামাজা করে পরিবর্তন, বিচারকের ভুয়া সিল তৈরি, ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও জামিননামা তৈরির মতো জালিয়াতিতেও অপরাধী চক্রগুলো সুযোগ নিচ্ছে।

মামলার নথি দেখা, নকল তোলা, ওকালতনামা জমা, জামিননামা জমা কিংবা দ্রুত সমন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পাঠানোর মতো কাজেও অনেক ক্ষেত্রে ‘বকশিশ’ ছাড়া কাজ এগোয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফলে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের অনেকেই বাধ্য হয়ে উমেদারদের ওপর নির্ভর করছেন। অথচ এসব ব্যক্তির আদালতের সরকারি কর্মচারী হিসেবে কোনো নিয়োগ বা আনুষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা নেই।

হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা, বাস্তবে উল্টো চিত্র

২০১৫ সালের ২৩ জুলাই আদালতে উমেদার নিষিদ্ধের বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া বহিরাগত ব্যক্তির মাধ্যমে আদেশ বা মামলাসংশ্লিষ্ট বিষয় লিপিবদ্ধ করা আইনবহির্ভূত ও উদ্বেগজনক।

আদালতের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর নথি হারিয়ে যাওয়া, ঘষামাজা কিংবা গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কার কথাও ওই নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি উমেদারের মাধ্যমে আদালতের আদেশ বা অন্য বিষয় লিপিবদ্ধ না করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।

কিন্তু প্রায় এক যুগ পরও দেশের আদালতগুলোতে উমেদারদের উপস্থিতি বন্ধ হয়নি। বরং আদালতের কাজের সঙ্গে তারা অনেকটাই নিয়মিতভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছেন।

ঢাকার আদালতেই ৫ শতাধিক

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার অধস্তন আদালতগুলোতে ৫ শতাধিক উমেদার কাজ করছেন।

ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের অধীন ৩৭টি আদালতে ৭২ জন উমেদার রয়েছেন। চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীন ৯টি আদালতে রয়েছেন প্রায় ১৮ থেকে ২০ জন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের অধীন আদালতগুলোতে রয়েছেন প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ জন।

ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অধীন আদালতগুলো মিলিয়ে উমেদারের সংখ্যা ১১২ জন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল, মানবপাচার ট্রাইব্যুনাল ও অর্থঋণ আদালতসহ বিভিন্ন আদালতেও উমেদার রয়েছেন।

বছরের পর বছর একই কাজ

উমেদারদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে আদালতে কাজ করছেন। কেউ কেউ ২০ থেকে ৩০ বছর, এমনকি তারও বেশি সময় ধরে এ পেশায় রয়েছেন।

জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের উমেদার মো. আনিস জানান, তিনি ১২ বছর ধরে উমেদার হিসেবে কাজ করছেন। কোনো সরকারি নিয়োগ না থাকায় বেসরকারিভাবেই কাজ করছেন তিনি এবং বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের দেওয়া বকশিশের অর্থেই জীবিকা নির্বাহ করেন।

ঢাকা মহানগর আদালতের উমেদার মো. পায়েলের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলেও তাদের স্থায়ী হওয়ার সুযোগ নেই। সরকারি বেতন পেলে বকশিশের ওপর নির্ভর করতে হতো না বলেও তিনি জানান।

আদালতে কর্মী সংকটই কি মূল কারণ

আদালত সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ বলছে, উমেদারদের উপস্থিতির অন্যতম কারণ সরকারি কর্মচারীর সংকট। মামলার সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে আদালতে নতুন পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ হয়নি।

ঢাকার দুই নম্বর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পেশকার মো. রাশেদ বলেন, তাদের আদালতে সরকারি কর্মচারী রয়েছেন মাত্র দুজন। অথচ প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মামলার কাজ সামলাতে হয়। এ কারণে উমেদার রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ বিচার বিভাগীয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সদ্য সাবেক সভাপতি ও শরীয়তপুর চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির মো. রেজোয়ান খন্দকারও আদালতে কর্মচারী সংকটের কথা তুলে ধরেন। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে নতুন পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ না হওয়ায় উমেদারদের দিয়ে কাজ করানোর প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

আইনজীবীদের অভিযোগ, কমছে না ভোগান্তি

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম হিমেলের অভিযোগ, উমেদারদের মাধ্যমে আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নথি সহজেই বাইরের মানুষের হাতে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তার মতে, আদালতে সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা বাড়িয়ে উমেদারি প্রথা বন্ধ করা গেলে ঘুষের কারবার ও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি দুটিই কমবে।

অন্যদিকে ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির আরিফুর রহমান উমেদার থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়া বা মামলার নথিতে হাত দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, উমেদাররা মূলত পেশকারদের সহযোগিতা করেন এবং দৈনিক সামান্য বকশিশ পান।

অভিজ্ঞ উমেদারদের নিয়োগের প্রস্তাব

বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব ও সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মো. শাহজাহান সাজুর মতে, আদালতের কাজের চাপের তুলনায় জনবল কম থাকায় দীর্ঘদিন ধরে উমেদারদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, উমেদাররা ফাইল খুঁজে দেওয়া, ফাইল এগিয়ে দেওয়া এবং কখনো কখনো প্রসিডিউরাল অর্ডার লেখার মতো কাজ করেন। তবে বিচারিক আদেশ লেখার সুযোগ তাদের নেই। তার মতে, আদালতে সরকারি কর্মচারী নিয়োগ বাড়ানো গেলে উমেদারি প্রথা বন্ধ করা সম্ভব।

তবে ঢাকা মহানগর আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) হারুনুর রশিদ আদালতের বাস্তব কর্মী সংকট বিবেচনায় অভিজ্ঞ উমেদারদের কাজের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, প্রত্যেক আদালতে মাত্র দুই-তিনজন সরকারি কর্মচারী দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মামলার কাজ সামলানো কঠিন। দীর্ঘদিন কাজ করা উমেদারদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সরকারি নিয়োগ দেওয়া হলে একদিকে কর্মী সংকট কমবে, অন্যদিকে উমেদারি প্রথারও অবসান ঘটানো সম্ভব হবে।

হাইকোর্টের নির্দেশনার পরও যদি আদালতের ভেতরে উমেদারদের দাপট অব্যাহত থাকে, তাহলে সেই নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রয়োগ কোথায় এ প্রশ্ন থেকেই যায়।

আদালতের নথি ও বিচারিক কার্যক্রম যত বেশি বহিরাগতদের হাতে থাকবে, ততই বাড়বে অনিয়ম ও নথি জালিয়াতির ঝুঁকি। তাই সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিকে আদালতের জনবল সংকট দূর করা, অন্যদিকে উমেদারদের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি ও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

ন্যায়বিচারের জন্য আদালতে আসা মানুষ যেন একটি নথি দেখা কিংবা মামলার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে কারও হাতে ‘বকশিশ’ দিতে বাধ্য না হন- এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

বিজ্ঞাপন

আরো

তাহমিনা ইসলাম - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর