ঢাকা: আন্তর্জাতকি মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে এবং মূল্যস্ফীতির চোখ রাঙনির প্রেক্ষিতে নুতন করে মুদ্রানীতি ঘোষণা হতে যাচ্ছে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর)। এটি চলতি বছরে তৃতীয় বারের মতো মুদ্রানীতি ঘোষণা। এবং ত্রৈমাসিক পদ্ধতির প্রথম ঘোষণাও বটে। এর মধ্য দিয়ে দেশ ৫৫ বছরের ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলকে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। একই ধারবাহিকতায় আগামী বছর থেকে বছরে তিন মাস পর পর চার বার মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে।
এর আগে সাধারণত ষান্মসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হতো। এ বছরের সর্বশেষ মুদ্রানীতিতে নীতিসুদহার অপরিবর্তিত থাকছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে টাকার মান কমার ইঙ্গিত মিলেছে। সেই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের সুদহারে পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, মূল্যস্ফীতি এখনো লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল হয়েছে ও ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে। সেই সঙ্গে একই সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও নতুন বেতন কাঠামো মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে নানা প্রাক-অর্থায়ন এবং পুনঃঅর্থায়নের সুদের হারের পরিবর্তন হতে পারে। যদিও এগুলো কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি পর্যালোচনায় উঠে এসছে, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সাল থেকে ২০০৫ পর্যন্ত বছরে একবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সাল থেকে সেই নীতি থেকে সরে বছরে ২ বার মুদ্রানীতি ঘোষণা শুরু হয়, যা ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। কিন্তু ২০১৯-২০, ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ অর্থবছর একবার করে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। তবে ২০২২ সালের জুলাই থেকে পুনরায় ছয় মাস করে বছরে দু’বার মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রচলন শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এই মুদ্রানীতি ঘোষণা নিয়ে আইএমএফ নানা চাপ দেয় বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকতারা জানান। অবশেষে সংস্থাটির চাপের মুখেই ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বছরে চার বার মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক- এমন মন্তব্য তাদের । বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন সারাবাংলাকে বলেন, ‘ছয় মাসের বদলে প্রতি তিন মাসে মুদ্রানীতি ঘোষণা সময়োপযোগী পদক্ষেপ। মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলালে মুদ্রানীতি নিয়মিত পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হবে। এতে বাজারও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সময় মতো ধারণা পায়।’
তিনি বলেন, ‘মুদ্রানীতিতে নির্ভরযোগ্য তথ্য, ভালো পূর্বাভাস ও দক্ষ বিশ্লেষণ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। তথ্য অসম্পূর্ণ হলে নীতির বারবার পরিবর্তন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তাই সিদ্ধান্তের কারণ, ঝুঁকি ও মূল্যস্ফীতি-প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস পরিষ্কারভাবে জানানো জরুরি। তবে খাদ্য বা জ্বালানির সরবরাহজনিত মূল্যস্ফীতি শুধু সুদের হার দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সরকারের অন্যান্য নীতিগুলোও এর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।’
জানা গেছে, গত জুলাইয়ে প্রায় ছয় বছর পর প্রথমবারের মতো নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর জরুরি ঋণ নেওয়ার সর্বোচ্চ সুদহার বা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়। তবে ব্যাংকের অতিরিক্ত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখার সুবিধা ‘স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)’ ৭ দশমিক ৫০ শতাংশেই রাখা হয়।
এর পর সেপ্টেম্বরের এমপিসি সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। আর মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হলেও তা এখনো সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ঝুঁকি মূল্যস্ফীতিকে ফের বাড়িয়ে দিতে পারে। এসব পরিস্থিতির প্রভাব মূল্যায়ন করে পরবর্তী সময়ে নীতি সুদহার পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব বলছে, আগস্টে দেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতিতে সামান্য স্বস্তি এলেও তা এখনো লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ১২ মাসের চলমান গড় মূল্যস্ফীতিও আগস্টে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে ছিল।
মুদ্রানীতির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হচ্ছে। এতে বাজার ও অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে দ্রুত নীতি পরিবর্তন ও পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।’