Sunday 25 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

পাওনা শোধ ও আপস হলে চেক মামলায় কারাদণ্ড নয়: হাইকোর্ট

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৪:৫৮ | আপডেট: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭:০৭

হাইকোর্ট। ফাইল ছবি

ঢাকা: নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (এনআই অ্যাক্ট), ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় দায়ের করা চেক ডিজঅনার মামলায় চেকে উল্লেখিত পাওনা সম্পূর্ণ পরিশোধ এবং পক্ষগুলোর মধ্যে আপস হলে অভিযুক্তকে কারাগারে পাঠানো বা কারাদণ্ড বহাল রাখা সমীচীন নয় বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত বলেছেন, চেক ডিজঅনার মামলার মূল উদ্দেশ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া বা কারাগারে পাঠানো নয় বরং পাওনা অর্থ আদায় নিশ্চিত করাই এ ধরনের মামলার প্রধান লক্ষ্য।

মো. আবদুল হান্নান মাস্টার বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য মামলায় বিচারপতি মো. বশির উল্লাহর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর রায়টি দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

মামলাটিতে আপিলকারীর পক্ষে রায় ঘোষণার সময় কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। বিবাদী ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. জিসান মাহমুদ। তাকে সহায়তা করেন আইনজীবী তাসনুভা কায়সার। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সিরাজুল করিম (রবি)।

এক বছরের কারাদণ্ড বাতিল

রায়ে হাইকোর্ট চেকের পুরো টাকা এবং ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করে পক্ষগুলোর মধ্যে আপস-মীমাংসা হওয়ায় আবদুল হান্নার মাস্টারের এক বছরের কারাদণ্ড বাতিল করেছেন।

একই সঙ্গে বিচারিক আদালতে আগে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ১০০ টাকা ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

তবে আদালত আসামির দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি বহাল রেখেছেন। একই সঙ্গে ৮৪ হাজার ৩৭৫ টাকা অর্থদণ্ড কমিয়ে চেকে উল্লেখিত অর্থের সমপরিমাণ ২৮ হাজার ১২৫ টাকা নির্ধারণ করেছেন।

যেভাবে শুরু হয়েছিল মামলা

মামলার নথি অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা মো. আবদুল হান্নান মাস্টার ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেন। পরে তিনি ২১ হাজার ৮৭৫ টাকা পরিশোধ করেন। বাকি ২৮ হাজার ১২৫ টাকা পরিশোধের জন্য তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সিরাজগঞ্জ শাখার একটি চেক দেন।

২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি চেকটি ব্যাংকে নগদায়নের জন্য উপস্থাপন করা হলে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় ১০ ফেব্রুয়ারি তা ডিজঅনার হয়। পরে আইন অনুযায়ী লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হলেও টাকা পরিশোধ না করায় একই বছর তার বিরুদ্ধে চেক ডিজঅনারের মামলা করা হয়।

মামলাটি ২০১২ সালে বিচারের জন্য সিরাজগঞ্জের দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তরিত হয়। আসামি পলাতক থাকায় তার অনুপস্থিতিতেই বিচার সম্পন্ন করা হয়।

২০১৩ সালের ১৯ মার্চ সিরাজগঞ্জের দায়রা জজ আদালত তাকে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৮৪ হাজার ৩৭৫ টাকা জরিমানা করেন।

আপিলের পর পরিশোধ করা হয় পাওনা

ওই রায়ের বিরুদ্ধে আবদুল হান্নান মাস্টার হাইকোর্টে ক্রিমিনাল আপিল করেন এবং জামিনের আবেদন জানান। পরে ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট হাইকোর্ট তাকে এক বছরের জন্য জামিন দেন।

আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় তিনি চেকের বাকি অর্থ ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে পরিশোধ করেন। এ বিষয়ে চলতি বছরের ২১ জুলাই আবদুল হান্নান মাস্টার ও ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের মধ্যে একটি আপসনামা স্বাক্ষরিত হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

রায়ে হাইকোর্ট মামলার পারিপার্শ্বিকতা, অপরাধের মাত্রা এবং আপিলকারী কর্তৃক চেকের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের বিষয় বিবেচনায় নেন।

আদালত দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখলেও কারাদণ্ড বাতিল করেন এবং অর্থদণ্ড ৮৪ হাজার ৩৭৫ টাকা থেকে কমিয়ে চেকে উল্লেখিত ২৮ হাজার ১২৫ টাকা নির্ধারণ করেন।

রায়ে আদালত আরও উল্লেখ করেন, আপিলকারী আপিল দায়েরের আগেই বিচারিক আদালতে ১৪ হাজার ১০০ টাকা জমা দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট টাকা সরাসরি অভিযোগকারী ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে পরিশোধ করেন।

তাই বিচারিক আদালতে জমা থাকা ১৪ হাজার ১০০ টাকা যথাযথ শনাক্তকরণ সাপেক্ষে দ্রুত ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

একই সঙ্গে রায়ের অনুলিপি প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

‘মূল লক্ষ্য পাওনা টাকা আদায়’

ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের আইনজীবী মো. জিসান মাহমুদ বলেন, আদালত এ রায়ের মাধ্যমে আইনি সুবিচারের পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।

তিনি বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাওনা অর্থ আদায় করা, কাউকে অহেতুক শাস্তি দেওয়া নয়। আপিলকারী যেহেতু চেকের পুরো অর্থ পরিশোধ করেছেন এবং পক্ষগুলোর মধ্যে আপসনামা হয়েছে, তাই তার কারাদণ্ড মওকুফের বিষয়ে তারা ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিলেন।

তার ভাষ্য, আদালত চেকের সমপরিমাণ অর্থদণ্ড বহাল রেখে আপিলকারীর কারাদণ্ড বাতিল করায় তারা এতে কোনো আপত্তি করেননি। বরং আদালতের ন্যায়বিচারকেন্দ্রিক এ সিদ্ধান্তকে তারা স্বাগত জানিয়েছেন।

সারাবাংলা/ টিএম/ এএ
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর