Tuesday 29 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

আপিলের সুযোগ থাকলে সন্তানের জিম্মা নিয়ে হেবিয়াস করপাস রিট নয়: হাইকোর্ট

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৩:২১

ঢাকা: সন্তানের হেফাজত বা জিম্মা নিয়ে পারিবারিক আদালতের দেওয়া ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলে একই বিষয়ে সরাসরি হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

গর্ভধারিণী মায়ের করা এমন এক রিটে জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই এ রায় দেন। ‘রোজিনা আক্তার বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ২১ পৃষ্ঠার ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি কাজী জিনাত হক।

বিজ্ঞাপন

রায়ের তথ্য অনুযায়ী, সাভারের হেমায়েতপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন ভোলার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন ও তার স্ত্রী রোজিনা আক্তার। ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সাভারের একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের ছেলে সন্তান বাসমিন আবরাবের জন্ম হয়।

জন্মের পর শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৭ জুলাই তাকে সাভারের একটি বেসরকারি হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য একই দিনে মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ১৯ জুলাই শিশুটিকে সেখানে ভর্তি করা হয় এবং লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।

রিটকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় দেশজুড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সহিংসতা ও কারফিউ-লকডাউন পরিস্থিতির কারণে তারা নিরাপত্তা ও অর্থের সংস্থান করতে সাময়িকভাবে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

তাদের দাবি, হাসপাতালের ভর্তি ও চিকিৎসা বাবদ ৩৬ হাজার ১৩৮ টাকা পরিশোধ করার পর ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট হাসপাতালে গেলে কর্তৃপক্ষ প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা বিল দাবি করে। পরে অর্থের সংস্থানের জন্য তাঁরা ভোলায় ফিরে যান এবং পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা করেন।

রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল ভোলা থানা থেকে ফোন পেয়ে পরদিন সেখানে যান শিশুটির বাবা-মা। তখন তারা জানতে পারেন, ২০২৪ সালের ২২ জুলাই শিশুটির বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল।

পরে তারা জানতে পারেন, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন আজিমপুর ছোটমনি নিবাসে হস্তান্তর করা হয়।

এরপর বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক এক নিঃসন্তান দম্পতি শিশুটির অভিভাবকত্ব ও জিম্মা চেয়ে ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। রায়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই মামলায় ১০ দিনের মধ্যে একতরফাভাবে শিশুটির অভিভাবকত্ব, জিম্মা ও পাসপোর্ট সংগ্রহের বিষয়ে ডিক্রি দেওয়া হয়।

শিশুটিকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে গর্ভধারিণী মা রোজিনা আক্তার হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট করেন। ওই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত শিশুটিকে গর্ভধারিণী মায়ের কাছে তুলে দেওয়ার বিষয়ে রুল জারি করেছিলেন।

রিটের বিরোধিতা করে বিবাদীরা আদালতে বলেন, শিশুটিকে প্রায় দুই মাস মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এনআইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শিশুটির জৈবিক বাবা-মায়ের অবস্থান শনাক্ত করতে না পেরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে সরকারি প্রতিষ্ঠান আজিমপুর ছোটমনি নিবাসে হস্তান্তর করে।

বিবাদীদের দাবি, শিশুটির জৈবিক বাবা-মা তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুটি কোথায় ছিল সে বিষয়ে তারা যথাসময়ে কোনো জিডি করেননি এবং দীর্ঘ সময় শিশুটির সঙ্গে যোগাযোগও করেননি।

হাসপাতালের পক্ষ থেকেও আদালতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শিশুটিকে সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ভর্তির সময় শিশুটির বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি হাসপাতালে উপস্থিত হননি। পরবর্তী সময়ে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য।

হাসপাতালের দাবি, বকেয়া বিল থাকা সত্ত্বেও শিশুটির চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হয়। পরে চিকিৎসা শেষে ১৮ সেপ্টেম্বর তাকে আজিমপুর ছোটমনি নিবাসে হস্তান্তর করা হয়।

মামলার নথি ও উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট বলেন, শিশুটির বাবা-মা ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন, নাকি রাজনৈতিক সংঘাত ও আর্থিক সংকটের কারণে সাময়িকভাবে দূরে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন- এটি একটি বিতর্কিত বিষয়।

আদালতের মতে, রিট এখতিয়ারের সংক্ষিপ্ত শুনানিতে এমন বিতর্কিত তথ্যের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

হাইকোর্ট আরও বলেন, পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ২৩ ধারায় পারিবারিক আদালতের আদেশ বা ডিক্রির বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে আপিলের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। তাই কোনো বিষয়ে বিশেষায়িত আদালত এবং নির্দিষ্ট আপিলের ব্যবস্থা থাকলে একই বিষয়ে সরাসরি হাইকোর্টের রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করা সমীচীন নয়।

সার্বিক আইনি পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট রিটে জারি করা রুল খারিজ করে দেন এবং আগে দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বাতিল করেন।

তবে আদালত স্পষ্ট করে বলেন, গর্ভধারিণী মা তার সন্তানের জিম্মা ও অভিভাবকত্ব পাওয়ার জন্য আইন অনুযায়ী উপযুক্ত বিচারিক ফোরামে প্রতিকার চাইতে পারবেন। এ বিষয়ে তার আইনি পথ বন্ধ হয়নি।

একই সঙ্গে রায়ের অনুলিপি সংশ্লিষ্টদের কাছে অবিলম্বে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সারাবাংলা/টিএম/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর