ঢাকা: জুলাই জাতীয় সনদের সুপারিশ ও সংবিধান সংশোধনী বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই যাবতীয় আলোচনা সম্পন্ন করে জাতীয় সংসদে চূড়ান্ত রিপোর্ট উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সনদের মূল কাঠামোর বাইরে দেশ ও জাতীয় জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো পরিপূরক প্রস্তাব বা পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভা শেষে এসব কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
জাতীয় সংসদে সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বিল পাসসহ জুলাই জাতীয় সনদের অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি জানান, কিছু রাজনৈতিক দল মাঠে সংখানুপাতিক পদ্ধতির বিভ্রান্তি ছড়ালেও বিএনপির মূল লক্ষ্য সমঝোতার ভিত্তিতে সাংবিধানিক দূরদর্শিতা বজায় রাখা। সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত গঠিত বিশেষ কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরপরই আইন মন্ত্রণালয় থেকে সংসদে সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, জুলাই সনদে স্বাক্ষরিত অঙ্গীকারের পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচন ও দেশের বাজেট বর্ষ পরিবর্তনের মতো দূরদর্শী বিষয়েও সংবিধানে পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অর্থ বছরের শেষে জুন জুলাই মাসে অর্থ বরাদ্দের জটিলতা এড়াতে এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা নিশ্চিত করতে ১ এপ্রিল থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত নতুন বাজেট ইয়ার নির্ধারণের জন্য সংবিধানের দুটি বিশেষ জায়গায় পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া আগামী দিনের দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের ক্ষেত্রে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন এবং নিম্নকক্ষের ভোটের অনুপাত বা আসনের কাঠামোগত সিদ্ধান্ত দলীয় নির্বাচনী ইশতেহারে রাখা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ২৬টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১৫টি দল সশরীরে উপস্থিত হয়ে দুইজন বা তিনজন প্রতিনিধি পাঠায় এবং কয়েকটি দল নিজেদের লিখিত বক্তব্য দেয়। অসুস্থতা ও অনিবার্য কারণে কোনো কোনো দলের প্রতিনিধি শেষ মুহূর্তে উপস্থিত হতে না পারলেও তাদের অবস্থান ইতিবাচক ছিল বলে জানানো হয়েছে।
এছাড়া সনদে স্বাক্ষর না করা বা বৈঠকে না আসা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আলোচনার পথ এখনো উন্মুক্ত রয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, নিবন্ধিত বা অনিবন্ধিত যেকোনো রাজনৈতিক দল যদি লিখিত মতামত বা প্রস্তাব পাঠায়, কমিটি তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ করতে সংসদ সচিবালয় ও বিশেষ কমিটি প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি করে বৈঠকের আয়োজন করবে।
রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় বন্ধ এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সুন্দরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থবছর পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশে প্রচলিত ৩০ জুন অর্থবছর শেষ হওয়ার নীতির কারণে শেষ কোয়ার্টারে তাড়াহুড়ো করে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ ও ছাড় দেওয়া হয়। এতে বর্ষা মৌসুম হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে, কাজের মান খারাপ হয় এবং আর্থিক দুর্নীতি ও তসরুপের সুযোগ তৈরি হয়। এই অপচয় ও অনিয়ম রোধে সরকারের মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও ঋতুচক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১ এপ্রিল থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত নতুন অর্থবছর ধরা হবে। এই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন কার্যকর করতে সংবিধানে ও বিদ্যমান আইনে মোট দুটি স্থানে প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয় উঠে এসেছে।
আইনি প্রক্রিয়া ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন সংক্রান্ত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, একটি প্রতিষ্ঠিত ও স্বাধীন রাষ্ট্রে নতুন করে সংবিধান পুনর্লিখন বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজন পড়ে না। সংসদীয় ব্যবস্থার নিয়মানুযায়ী যেকোনো সংশোধনী গৃহীত হওয়াই এক ধরনের সংস্কার।
উদাহরণ দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে সময়ের প্রয়োজনে এবং জনদাবির মুখে বারবার সংবিধানে সংশোধনী আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত হয়ে কোনো সরকার সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে বা অন্যান্য দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারলে সমাজের চাহিদা অনুযায়ী সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে। কোনো গোষ্ঠী যেন মাঠে বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে সে জন্য সরকার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়েই ১৮তম সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদীয় বিষয়াবলি ও আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপন করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
সকল রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে যত দ্রুত সম্ভব সংসদে সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করাই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।