Tuesday 29 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

অ্যানথ্রাক্সের হটস্পট রংপুর, ১ মাসে আক্রান্ত ৫৩ জন

রাব্বী হাসান সবুজ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৩২

রংপুর: গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা রংপুর বিভাগে অ্যানথ্রাক্সের প্রধান হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গত একমাসে রংপুর, দিনাজপুর ও গাইবান্ধায় অন্তত ৫৩ জন অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে সুন্দরগঞ্জেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৭ জন। অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস বিতরণ থেকে এই সংক্রমণ ছড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, আক্রান্ত ব্যক্তিরা যে মাংস খেয়েছেন তা মূলত গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় পালিত গবাদিপশু থেকে এসেছে। গতবছরও একই সময়ে এই এলাকাগুলোতে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ‘সুন্দরগঞ্জ’

গত ৯ সেপ্টেম্বর সুন্দরগঞ্জের সর্বানন্দ ইউনিয়নের বাছহাটি গ্রামে একটি অসুস্থ গরু জবাই করা হয় এবং এর মাংস ১০০টি পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এর দুই সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে পাঁচটি ইউনিয়নে—সর্বানন্দ, তারাপুর, কাঁচিবাড়ি, সোনারায় এবং রামজীবন। ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯ জন নারী, ১৪ জন পুরুষ এবং ৪ জন শিশু অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বাছহাটি গ্রামের গোলেজা বেগম (২৯) সারাবাংলাকে জানান, অসুস্থ গরুর মাংস রান্না ও খাওয়ার পর পরই তার হাতে ফোসকা দেখা দেয়। একই গ্রামের শফিক আলম (৪৫) সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি মাংস খাইনি। শুধু জবাই করতে সাহায্য করেছিলাম। কিন্তু দুই হাতেই ফোসকা পড়েছে। জবাইয়ের সময় রক্ত আমার হাতে লেগেছিল।’

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে জানান, বাছহাটি গ্রাম থেকে ২১ সেপ্টেম্বর সংগৃহীত মাংসের দু’টি নমুনা ২৩ সেপ্টেম্বর পরীক্ষার রিপোর্টে অ্যানথ্রাক্স পজিটিভ পাওয়া গেছে।

রংপুর ও দিনাজপুরেও আক্রান্ত

রংপুর জেলায় এখন পর্যন্ত ১৩ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন। ২২ সেপ্টেম্বর পীরগাছা উপজেলার চাওলা ইউনিয়নের আদমপাড়া গ্রামে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়। রংপুর সিভিল সার্জন শাহীন সুলতানার বরাত অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে একই পরিবারের চার সদস্যসহ ১৩ জন পীরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়ে দশ দিন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। আইসিডিডিআর,বি-এর একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে অ্যানথ্রাক্স নিশ্চিত করেছে।’

চাওলা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুল হাকিম সারাবাংলাকে জানান, গরুটি পার্শ্ববর্তী গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা থেকে কিনে জবাই করা হয়েছিল।

দিনাজপুরে ২৯ আগস্ট পীরগাছা উপজেলায় একটি গৃহপালিত গরুর মাংস খাওয়ার পর একজন সেনাসদস্য এবং তার বাবা-মায়ের ল্যাব পরীক্ষায় অ্যানথ্রাক্স পজিটিভ ধরা পড়ে। তারা খোলাহাটি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। দিনাজপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আব্দুর রহিম সারাবাংলাকে জানান, এখন পর্যন্ত নতুন কোনো রোগী পাওয়া যায়নি।

টিকা দেওয়া হচ্ছে শুধু গরুকে

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্যানুযায়ী, উপজেলায় প্রায় ২ লাখ ৫৪ হাজার গবাদিপশু রয়েছে। গতবছর অক্টোবরে এই অঞ্চলে প্রাদুর্ভাবের পর সরকার ১৫টি ইউনিয়নে রিং টিকা কার্যক্রম শুরু করে এবং এ পর্যন্ত ১৯ হাজার গরুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী আক্রান্ত এলাকার তিন কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে শতভাগ গবাদিপশুকে টিকা দেওয়া বাধ্যতামূলক। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ইফতেখারুল ইসলাম জানান, হাতে ১১ হাজার ডোজ টিকার মজুদ রয়েছে এবং আরও ১৫ হাজার ডোজের চাহিদাপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

তবে আইসিডিডিআর,বি ও আইইডিসিআর-এর গবেষকরা জানিয়েছেন, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের মাধ্যমেও অ্যানথ্রাক্স ছড়াতে পারে। গতবছর সুন্দরগঞ্জের পশ্চিম বেলকা গ্রামের রোজিনা বেগম (৪৫) নামের এক নারী অসুস্থ ছাগলের মাংস রান্না ও খাওয়ার পর অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

কেন শুধু গরুকে টিকা দেওয়া হচ্ছে? জানতে চাইলে গাইবান্ধা জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. জোবায়দুল কবির সারাবাংলাকে জানান, এই অঞ্চলে প্রাদুর্ভাব ঐতিহাসিকভাবে গরু থেকে ছড়ায় বলে গবাদিপশুকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যদিও অন্যান্য প্রাণীদের বর্তমানে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

সরকারি পদক্ষেপ ও সতর্কতা

প্রাদুর্ভাবের পর ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে আইইডিসিআর-এর ছয়জন কর্মকর্তা এবং আইসিডিডিআর,বি-এর দুজন গবেষক সুন্দরগঞ্জে পৌঁছান। আইইডিসিআর কর্মকর্তারা আক্রান্ত এলাকায় গণসচেতনতা এবং অসুস্থ পশু জবাইয়ের আগে পশুচিকিৎসকের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করার উপর জোর দিয়েছেন।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইফফাত জাহান তুলি সারাবাংলাকে জানান, লাউডস্পিকার ঘোষণা, প্রশাসনিক সভা এবং মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে গ্রামবাসীদের নির্দেশনা দিয়ে জনসচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। যারা হাসপাতালে আসেননি কিন্তু উপসর্গ রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কামরুল হাসান সারাবাংলাকে জানান, অ্যানথ্রাক্স অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। এটি মূলত আক্রান্ত গবাদিপশুর সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা পুঁজের সংস্পর্শেও গৌণ সংক্রমণ হতে পারে। সঠিকভাবে ওষুধ খেলে অ্যানথ্রাক্স সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।

তিনি বলেন, ‘অ্যানথ্রাক্স একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। অসুস্থ পশু জবাই না করা, মাংস ভালোভাবে রান্না করা এবং গবাদিপশুর টিকা নিশ্চিত করা এই রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায়।’

বিজ্ঞাপন

ছবির গল্প ভাসমান চাষে সবজি উৎপাদন
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০০:১৭

আরো

সম্পর্কিত খবর