মুদ্রানীতি হলো একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত নীতি, যা দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে ও সুদের হার তথা অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রচলিত নিয়মানুসারে বছরে দুইবার (জানুয়ারি-জুন ও জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু দেশের এবং বিশ্বের অর্থনীতি যেভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে তাতে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা বছরে একের অধিক হলে অর্থনীতির জন্য ভালো। কারন আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে বছরে ছয়বার (দুই মাস অন্তর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশে গত কয়েক মাস ধরেই বহিঃঅর্থনীতির প্রভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তারল্য এবং বিনিময় হারে বড় ধরনের চাপ অনুভূত হতে দেখা গেছে। বিশেষত ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ এবং সুশাসনের চ্যালেঞ্জের কারণে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের এমন পরিস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখে মুদ্রানীতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এ সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের প্রধান উদ্বেগ। বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, এ নীতির ফলে ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতি কমবে, ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে শুরু করবে। এ আশাবাদ কতটুকু সফল হবে এ নিয়ে দ্বন্দের শেষ নেই বিশেষত: গভর্নর ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে।
এখন প্রশ্ন হলো মুদ্রানীতি কেবল অর্থনীতিবিদ কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ? যদি তাই হয় তবে এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। এটি গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে এসেছে। এটি কিছুটা স্বস্তির খবর। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় কমার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে পণ্য ও সেবার দামে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমানোর যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় এর চাপ দেশের অর্থনীতিতেও পড়বে। নতুন বেতন কাঠামোও মূল্যস্ফীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেতন বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। উৎপাদন ও সরবরাহ সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে না পারলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। তাই বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করাও জরুরি। অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিস্থিতি খুব স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে। শিল্প উৎপাদনও সংকুচিত হয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল। উচ্চ সুদ, জ্বালানি সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অনিশ্চিত চাহিদা বিনিয়োগের পথে বাধা তৈরি করছে। এখানেই মুদ্রানীতির বড় চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদের হার উচ্চ রাখতে হয়। আবার উচ্চ সুদ বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডকে স্থবির করে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা সহজ নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক তাই আপাতত নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগও রেখেছে। অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা ব্যাংকিং খাত। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু সুদের হার পরিবর্তন করে অর্থনীতিতে গতি আনা কঠিন। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, মূলধন পুনরুদ্ধার এবং ঋণ শৃঙ্খলা জোরদার করা জরুরি। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একাধিক চাপের মধ্যে রয়েছে। মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নতুন বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য প্রভাব এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে আছে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং উৎপাদন খাতের নানা সীমাবদ্ধতা।
তবে এর মধ্যে বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতিও হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের উদ্বৃত্ত ছিল ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার প্রধান কারণ আর্থিক হিসাবের ঘাটতি। এ সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা মিলেছে। আগামী অর্থবছরে অর্থনীতিতে দ্রুত পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে ধীরগতির পুনরুদ্ধার হতে পারে বলে ধারণা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের আগের ৪ দশমিক ৩ শতাংশের পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে।
মুদ্রানীতিতে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য, কঠোর বৈশ্বিক মুদ্রানীতি, দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, রাজস্ব খাতের চাপ, জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করাই এখন মুদ্রানীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ পরিস্থিতিতে শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন বাড়াতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে জ্বালানি সরবরাহ। উন্নত করতে হবে বিনিয়োগের পরিবেশ। ব্যাংকিং খাতে ফিরিয়ে আনতে হবে শৃঙ্খলা। দক্ষতা বাড়াতে হবে সরকারি ব্যয়েও। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে তথ্য ও বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে।
সবমেষে বলা যায় নতুন মুদ্রানীতির সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রক সাহসের ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই সমালোচনার মুখে পড়েছে, বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপানোর কারণে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই সাথে মুদ্রানীতি কঠোর দেখালেও বাস্তবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতে প্রকৃত স্থিতি আনতে হলে মুদ্রানীতির পাশাপাশি কয়েকটি বিষয় জরুরি। প্রথমেই বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমানতকারীদের ক্ষতি পূরণে স্পষ্ট রোডম্যাপ ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন হলো- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ঘোষিত মুদ্রানীতি স্বল্পমেয়াদে কিছু আর্থিক সূচকে শৃঙ্খলা আনতে পারলেও, ব্যাংক খাতের গভীর কাঠামোগত সঙ্কট সমাধানে এটি একা যথেষ্ট নয়। যদি নতুন নীতি আবারো পুরনো সমস্যাকে আড়াল করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে স্থিতিশীলতার বদলে আস্থার সঙ্কট আরো ঘনীভূত হবে। এখন সময় অর্ধসমাধান নয়, বরং কঠোর ও ন্যায্য সংস্কারের, বানিজ্য সহায়ক অবকাটামো নির্মান করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা: রাজনৈতিক পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারী প্রতিষ্ঠান বিশেষত: ব্যাংক গুলোকে শক্তিশালী করা ও রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রাখা। কাজেই এই সকল সমস্যাগুলো সমাধান কল্পে ঘোষিত মূদ্রানীতিতে আলেচিত বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে। তাহলেই দেশের কাঙ্কিত প্রবৃদ্ধি অর্জন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রন ও কর্মসংন্থান সৃষ্টি সম্ভব হবে।
লেখক: অধ্যাপক (অর্থনীতি), সাবেক পরিচালক, বার্ড (কুমিল্লা), সাবেক ডিন (ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ) ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা