Tuesday 06 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ব্রাজিলের এক বিষাদময় তেজস্ক্রিয় ট্র্যাজেডি, ৬ বছরের শিশুর ৭০০ কেজির কফিন

ফারহানা নীলা
৬ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:০৭

১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস। ব্রাজিলের গোইয়ানিয়া শহরের বাতাস তখন আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই শান্ত ছিল। কিন্তু সেই শান্ত আবহাওয়ার আড়ালে নিঃশব্দে এক মহাবিপদ ঘাতক হয়ে থাবা বসাচ্ছিল। শহরের কেন্দ্রস্থলে পরিত্যক্ত এক হাসপাতালের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে বহু বছর ধরে নীরবে পড়ে ছিল ক্যানসার চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত একটি পুরোনো রেডিওথেরাপি যন্ত্র। চিকিৎসাকেন্দ্রটি স্থানান্তরিত হলেও অসচেতনতার কারণে সেই ভারী সরঞ্জামটি রক্ষিত হয়নি কোনো নিরাপদ প্রহরায়। দারিদ্র্যের তাড়নায় লোহালক্কড় আর ভাঙারি সংগ্রাহক দুই তরুণ কেবল কয়েক কেজি স্ক্র্যাপ ধাতুর আশায় যন্ত্রটি ভেঙে ভেতরের ক্যাপসুলটি বের করে আনেন। তারা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি, লোহার ভারী আবরণের ভেতরে তারা আসলে এমন এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুদূতকে মুক্ত করে দিচ্ছেন, যা চোখের পলকে এক প্রাণবন্ত শহরকে পরিণত করবে বিভীষিকাময় মৃত্যুকূপে।

বিজ্ঞাপন

যন্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে ছিল সিজিয়াম-১৩৭ নামের এক মারাত্মক তেজস্ক্রিয় পদার্থের গুঁড়ো। অন্ধকারে এর থেকে ঠিকরে বের হচ্ছিল এক অদ্ভুত, মায়াবী নীল আলো। এই অপার্থিব আলো মানুষকে আশঙ্কিত না করে বরং মোহিত করেছিল বেশি। একজন স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী কৌতূহল সামলাতে না পেরে সেই মন্ত্রপূত বস্তুটি নিজের ঘরে নিয়ে যান। নীল আলোর জাদুতে মুগ্ধ হয়ে তিনি প্রতিবেশী, স্বজন ও ছোট্ট শিশুদের ডেকে এনে দেখান সেই বিস্ময়কর দৃশ্য। অন্ধকার ঘরে জোনাকির মতো জ্বলজ্বল করা সেই বিষাক্ত গুঁড়ো অনেকে চালের দানার মতো কুড়িয়ে নেন, অনেকে আবার উৎসবের রঙ মাখার মতো শরীরে মেখে আনন্দ প্রকাশ করেন। মানুষ জানত না যে অদৃশ্য শত্রু তার মারাত্মক বিষ ঢেলে দিচ্ছে তাদের রক্তে ও কোষের গভীরে। তেজস্ক্রিয়তার কোনো গন্ধ নেই, কোনো শব্দ নেই, স্পর্শে অনুভবের সুযোগও নেই। তাই মারণব্যাধি যখন শরীরের গভীরে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছিল, তখনও গোইয়ানিয়ার সাধারণ মানুষের মুখে ছিল নিষ্পাপ বিস্ময়ের হাসি।

কয়েক দিনের মধ্যেই সেই রঙিন বিস্ময় রূপ নেয় এক ভয়াবহ কান্নায়। শহরের আনাচে-কানাচে মানুষ হুট করে অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করে। অনবরত বমি, তীব্র ডায়রিয়া, চুল পড়ে যাওয়া আর গায়ের ত্বকে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি হওয়া—সব মিলিয়ে এক অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে গোইয়ানিয়াকে। স্থানীয় চিকিৎসকরাও প্রথমে বুঝতে পারছিলেন না এই অজানা রোগের রহস্য। ততক্ষণে মানুষের অনভিজ্ঞ হাত, কাপড়ের স্পর্শ, আসবাবপত্র ও খাবারের মাধ্যমে সেই মারাত্মক রেডিয়েশন ঘরের সীমানা ছাড়িয়ে শহরের বাতাসে ও মাটিতে মিশে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র।

এই শোকাবহ রূপকথার সবচেয়ে বিষাদময় চরিত্রে পরিণত হয় লাইডে ফেরেইরা নামের মাত্র ছয় বছরের একটি নিষ্পাপ শিশু। বিশ্ব ও পরমাণু বিজ্ঞানের নির্মমতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এই অবোধ মেয়েটি কেবল এক মুঠো জাদুকরী নীল আলো নিয়ে খেলতে চেয়েছিল। খেলার ফাঁকে তেজস্ক্রিয় সিজিয়াম লেগে যায় তার ছোট্ট দুটি হাতে। সেই হাত দিয়েই সে পরম নিশ্চিন্তে খায় তার স্যান্ডউইচ। বাহ্যিক তেজস্ক্রিয়তা যেখানে শরীরকে বাইরে থেকে পোড়ায়, সেখানে অভ্যন্তরীণ তেজস্ক্রিয় কণা ২৪ ঘণ্টা ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়। লাইডের ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছিল। আইএইএ-এর হিসাব অনুযায়ী, তার কচি শরীরে প্রবেশ করেছিল প্রায় ১ বিলিয়ন বেকেরেল তেজস্ক্রিয় সিজিয়াম। প্রায় এক মাস দশ দিন ধরে যন্ত্রণার সাথে লড়াই করে ১৯৮৭ সালের ২৩ অক্টোবর মাত্র ছয় বছর বয়সে লাইডে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে।

মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি শিশুটির যন্ত্রণা ও লাঞ্ছনা। তার মৃতদেহ সাধারণ নিয়মে সৎকার করা সম্ভব ছিল না, কারণ তার পুরো শরীর থেকে অনবরত অনিয়ন্ত্রিত রেডিয়েশন বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। মাটি ও পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে তৈরি হয় সীসার আস্তরণযুক্ত ভারী কফিন। যে নিষ্পাপ শিশুটির ওজন ছিল মাত্র ২০ কেজি, সীসার ভারী প্রলেপের কারণে তার কফিনের ওজন দাঁড়ায় প্রায় ৭০০ কেজি। স্থানীয় মানুষ ভয়ে ও আতঙ্কে সেই দাফনে বাধা দিতে চেয়েছিল, ভেবেছিল লাশ হয়তো বিস্ফোরিত হতে পারে। বৈজ্ঞানিক সতর্কতার চরম খেসারত দিয়ে অবশেষে অতি কষ্টে কবরে নামানো হয় ছোট্ট লাইডের সীসার কফিন।

রোগীদের শারীরিক লক্ষণ এবং এক সচেতন চিকিৎসকের বুদ্ধিমত্তায় যখন গোইয়ানিয়ায় তেজস্ক্রিয়তার উপস্থিতি ধরা পড়ে, তখন ব্রাজিলীয় সরকার ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) দ্রুত জরুরি অবস্থা জারি করে। গোটা শহর ও মানুষকে তেজস্ক্রিয়তামুক্ত (Decontamination) করতে মানবইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও কঠিন উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়।

গোইয়ানিয়ার অলিম্পিক স্টেডিয়ামকে একটি অস্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়। শহরের ১১২,০০০-এরও বেশি মানুষকে বিশেষ গাইগার কাউন্টার (Geiger counter) দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ২৪৯ জনের শরীরে বিপজ্জনক মাত্রায় তেজস্ক্রিয়তার উপস্থিতি মেলে এবং তাদের দ্রুত উদ্ধার করে আলাদা কোয়ারেন্টাইনে বিশেষ আইসোলেশন চিকিৎসায় পাঠানো হয়।

যাদের শরীরের ভেতরে তেজস্ক্রিয় সিজিয়াম প্রবেশ করেছিল (যেমন লাইডে এবং অন্যান্য রোগীরা), তাদের শরীর থেকে দ্রুত সেই বিষ বের করার জন্য ‘প্রাশিয়ান ব্লু’ (Prussian Blue) নামের একটি বিশেষ প্রতিষেধক ঔষধ প্রয়োগ করা হয়। এই ঔষধটি পরিপাকতন্ত্রে থাকা সিজিয়ামকে আবদ্ধ করে মলের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে।

তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানো রোধ করতে মারাত্মকভাবে দূষিত বাড়িঘর ও ভবনগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। আক্রান্ত এলাকার রাস্তার উপরের স্তরের মাটি কেটে চেঁচে তুলে ফেলা হয় এবং গাছপালা কেটে ফেলা হয়। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ও বিশেষ কেমিক্যাল ব্যবহার করে আশপাশের দেয়াল ও রাস্তা ধোয়া হয়।

এই বিশাল উদ্ধার অভিযানে তৈরি হওয়া প্রায় ৩,৫০৩ ঘনমিটার (বা প্রায় ৪,৫০০ টন) তেজস্ক্রিয় বর্জ্য বিশেষ ভারী কংক্রিটের ড্রামে সিলগালা করে শহরের বাইরে আবানিয়া (Abadia de Goiás) নামক স্থানে স্থায়ী ভূগর্ভস্থ তেজস্ক্রিয় বর্জ্যাগারে নিরাপদে পুতে ফেলা হয়।

গোইয়ানিয়ার এই দুর্ঘটনায় শেষ পর্যন্ত চারজন মানুষের করুণ সলিল সমাধি ঘটে এবং বহু মানুষ সারাজীবনের মতো পঙ্গুত্ব ও ক্ষতের দাগ বহন করে বেঁচে থাকে। কঠোর বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ ও উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত গোইয়ানিয়ার মানুষ সেই অদৃশ্য বিষের থাবা থেকে মুক্তি পায়। একটি পরিত্যক্ত হাসপাতালের হেফেজতি গাফিলতি, মানুষের না জানা কৌতূহল আর এক বিষাক্ত নীল আলোর মোহ কীভাবে একটা সাজানো সংসার ও শহরকে ছারখার করে দিয়েছিল, ইতিহাস তা কোনোদিন ভুলবে না। আর গোইয়ানিয়ার সেই ট্র্যাজেডির চিরন্তন প্রতীক হয়ে মাটির নিচে এক ভারী সীসার কফিনে ঘুমিয়ে আছে শিশু লাইডে ফেরেইরা।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন