Wednesday 07 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মাছ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা / ‘নদীতে নামা যাবে না, কিন্তু পেট তো থেমে থাকবে না’

সুজন কুমার বিষ্ণু, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৩:৫৯ | আপডেট: ৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৪:০১

পদ্মায় মাছ শিকারে আসছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। সেই প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে নদীর ঘাটে। ছবি: সারাবাংলা

রাজবাড়ী: ‘নদীতে নামা যাবে না। কিন্তু, পেট তো থেমে থাকবে না। ২২ দিন সংসার চলবে ক্যামনে? এই পেশা ছাড়া তো করার মতো অন্য কিছু নাই’— রাজবাড়ীর পদ্মাপাড়ের অনেক জেলের কণ্ঠে এখন এমনই আক্ষেপের সুর। পদ্মায় ২২ দিনের মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান শুরু হচ্ছে ৮ অক্টোবর। কিন্তু, পদ্মাপাড়ের প্রকৃত অনেক জেলের হাতে নেই সরকারি জেলে কার্ড। আবার কার্ডধারীদেরও বেশ কয়েকজন পাচ্ছেন না সরকারি সহায়তার চাল। ফলে নিষেধাজ্ঞার ২২ দিনের দুশ্চিন্তা নিয়ে কেউ জাল গোছাচ্ছেন, কেউ নৌকা মেরামত করছেন, আবার কেউ বলছেন, ‘পেটের দায়ে লুকিয়ে হলেও নদীতে নামতে হবে।’

জেলেদের অভিযোগ, বছরের পর বছর নদীতে মাছ ধরলেও তাদের অনেকেরই সরকারি জেলে কার্ড নেই। অন্যদিকে যারা নিয়মিত মাছ ধরেন না, কৃষিকাজ, ব্যবসা কিংবা অন্য পেশার সঙ্গে জড়িত— তাদের কারও কারও জেলে কার্ড রয়েছে। ফলে প্রকৃত জেলেরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

রাজবাড়ী জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, জেলার পাঁচ উপজেলার মধ্যে রাজবাড়ী সদর, পাংশা, কালুখালী ও গোয়ালন্দ পদ্মা নদীবেষ্টিত। মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিতে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত পদ্মা নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে। এসব এলাকায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৪ হাজার ১০২ জন। এর মধ্যে ইলিশ শিকারের সঙ্গে জড়িত কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৩০৪ জন। তবে এবারের মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে ভিজিএফ সহায়তার চাল বরাদ্দ এসেছে ৫ হাজার ৫৯২ জন জেলের জন্য। ফলে কার্ডধারী হয়েও বরাদ্দ স্বল্পতার কারণে ৭১২ জন জেলে সরকারি চালের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

রাজবাড়ীর বরাট, মিজানপুর ও দৌলতদিয়া এলাকার পদ্মা নদীর তীরে সরেজমিনে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞার আগে জেলেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন নৌকা ও জাল মেরামতে। কেউ জাল ঠিক করছেন, কেউ নৌকায় আলকাতরা দিচ্ছেন, আবার কেউ মাছ ধরার সরঞ্জাম গুছিয়ে নিচ্ছেন। বরাট ইউনিয়নের অন্তরমোড়ে নদীর কূলে জাল ঠিক করছিলেন শাকিল শেখ। প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে নদীতে মাছ ধরলেও তার নেই জেলে কার্ড।

শাকিল শেখ সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার দু’টি নৌকা আছে। আমরা তিনজন মিলে একটি নৌকায় মাছ ধরি। অথচ যাদের নৌকা নেই, যারা মাছ ধরে না, ভ্যান-রিকশা চালায়, তাদেরও কার্ড দেওয়া হয়েছে। আমরা ১২ মাস মাছ ধরি, তারপরও আমাদের কার্ড দেওয়া হয়নি।’

পদ্মায় মাছ শিকারে আসছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। সে জন্য অনেক জেলে জাল গুটিয়ে রাখছেন। ছবি: সারাবাংলা

পদ্মায় মাছ শিকারে আসছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। সে জন্য অনেক জেলে জাল গুটিয়ে রাখছেন। ছবি: সারাবাংলা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক জেলে সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাড়িতে পাঁচ থেকে সাতজন মানুষ আছে। তাদের কথা চিন্তা করে আমাদের নদীতে নামতেই হবে। এই পেশা ছাড়া তো আমাদের করার মতো অন্য কিছু নেই। তাই নিষেধাজ্ঞার সময় লুকিয়ে মাছ ধরতে হবে। প্রস্তুতি কমবেশি তো আছেই।’

মিজানপুর ইউনিয়নের কালীতলা এলাকায় পদ্মার তীরে জাল মেরামত করছিলেন জেলে রুবেল। তার জেলে কার্ড আছে। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘জানি ২২ দিন মাছ ধরা যাবে না। তাই জালগুলো ঠিক করে তুলে রাখব।’ সরকারের দেওয়া সহায়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদের ২৫ কেজি করে চাল দেয়। কিন্তু একটি পরিবারে চার থেকে ছয়জন মানুষ থাকে। এই চাল দিয়ে কি সংসার চলে? চালের পাশাপাশি আরও অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়।’

মাথায় জাল নিয়ে মাছ ধরার উদ্দেশে নদীর দিকে যাচ্ছিলেন মনির। প্রায় আট বছর ধরে নদীতে মাছ ধরলেও এখনো জেলে কার্ড মেলেনি তার। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘যারা মাছ ধরে না, কৃষিকাজ বা অন্য কাজ করে, তাদের কার্ড আছে।’

কার্ড নেই এমন এক জেলে সারাবাংলাকে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে অনেক মাছ পাওয়া যায়। এজন্য ঝুঁকি নিয়ে নদীতে নামি। কী করব, আমাদের তো খেতে হবে। চালও পাই না, কোনো সহযোগিতাও পাই না। আমার নিজের নৌকাসহ সবই আছে। অভিযানের সময় নদীতে যেতে ভয় তো করে। কিন্তু কী করব, পেট তো আছে।’

ধাওয়াপাড়া ঘাটে নৌকা মেরামত করছিলেন জেলে জমির মোল্লা। আট থেকে ১০ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরলেও তার জেলে কার্ড হয়নি। তিনি বলেন, জেলে কার্ডের জন্য আবেদন করেছিলাম, কিন্তু হয়নি। যারা কৃষক, ব্যবসা করে, তাদের জেলে কার্ড আছে। প্রকৃত জেলেদের অনেকেরই কার্ড নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে অন্যের নৌকায় মাছ ধরতাম, এখন নিজের নৌকা আছে। এই ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকবে— এই সময় আমরা কী করব? সরকার যে জেলেদের ২৫ কেজি চাল দেয়, তা দিয়ে কি সংসার চলে? চালের সঙ্গে তো অনেক কিছু লাগে।’

নদীর তীরে নৌকায় আলকাতরা দিচ্ছিলেন সন্টু হালদার। প্রায় তিন যুগ ধরে নদীতে মাছ ধরছেন তিনি। সন্টু সারাবাংলাকে বলেন, ‘মাছ ধরাই আমাদের জাত-ব্যবসা। আমি প্রায় তিন যুগ ধরে নদীতে মাছ ধরি। সরকার নিষেধাজ্ঞার সময় শুধু চাল দেয়। এতে কি আর হয়? সংসার চালাতে আরও অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়। সবকিছুর দাম বাড়ছে।’

সরকারের কাছে বিকল্প কর্মসংস্থান ও পর্যাপ্ত সহযোগিতার দাবি জানিয়ে সন্টু হালদার বলেন, ‘সরকার আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা করুক অথবা মাছ ধরার পাশাপাশি অন্য কিছু করার ব্যবস্থা করে দিক। তাহলে নিষেধাজ্ঞার সময় কেউ নদীতে নামবে না।’

পদ্মায় মাছ শিকারে আসছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। সেই প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে নদীর ঘাটে। ছবি: সারাবাংলা

পদ্মায় মাছ শিকারে আসছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। সেই প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে নদীর ঘাটে। ছবি: সারাবাংলা

নিষেধাজ্ঞার সময়ও মাছ ধরার কারণ জানতে চাইলে আরেক জেলে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময় আমরা চুরি করেই মাছ ধরি। অভিযান হলে জাল রেখে পালাই। অনেককে ধরে নিয়ে যায়, জেল দেয়। কিন্তু পেটের অভাবে আমাদের যেতে হয়। আমার অন্য কোনো ব্যবসা নাই; জমিও নাই যে, চাষাবাদ করে খাব।’

জেলেদের ভাষ্য, তারা নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখতে চান। তবে পরিবারের খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে নদীতে নামেন। এতে তারা একদিকে আইনি ঝুঁকিতে পড়েন, অন্যদিকে মা ইলিশ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যও ব্যাহত হয়।

রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘মা ইলিশের প্রজননের জন্য এই ২২ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতে পারলে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে। নিষেধাজ্ঞা সফল করতে জেলে ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময়ে নিবন্ধিত জেলে পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলেরা যাতে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেন, সেজন্য মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের সচেতন করা হচ্ছে।’

প্রকৃত জেলেদের কার্ড না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর জেলে কার্ড হালনাগাদ করছি। অতীতে নিবন্ধিত কোনো জেলে মারা গেলে, বা পেশা পরিবর্তন করলে, অথবা কোনো কারণে অমৎস্যজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে থাকলে, তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ কেউ দিলে যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নতুন কোনো জেলে নিবন্ধন করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট উপজেলায় যোগাযোগ করতে হবে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত জেলে হলে তাকে কার্ড দেওয়া হবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রকৃত জেলেদের চিহ্নিত করে সরকারি সহায়তার আওতায় আনাও প্রয়োজন। শুধু অভিযান ও শাস্তির মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা সফল করা কঠিন।

প্রকৃত জেলেদের তালিকা হালনাগাদ, পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা এবং নিষেধাজ্ঞার সময়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে জেলেদের নদীতে নামার প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।

সারাবাংলা/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর