বলিউডের আলোর ঝলকানি এবং তারকাখচিত আভিজাত্যের ভিড়ে তিনি একেবারেই ব্যতিক্রমী এক নাম নানা পাটেকর। পর্দায় তার ডায়ালগ ডেলিভারির নিজস্ব ভঙ্গি আর তীক্ষ্ণ এক্সপ্রেশন যেমন দর্শকের বুকে কাঁপন ধরায়, তেমনি বাস্তব জীবনে তার মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ জীবনযাপন মানুষকে মুগ্ধ করে। তার অভিনীত চরিত্রগুলোর মতোই নানা পাটেকরের নিজের জীবনটিও বৈচিত্র্যময়, নাটকীয় এবং গভীর জীবনমুখী অভিজ্ঞতায় ভরপুর।
নানা পাটেকরের জন্ম ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের একটি অতি সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারে। আজ আমরা পর্দায় যে পরাক্রমশালী অভিনেতাকে দেখি, তার শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলো মোটেও রূপকথার মতো ছিল না। অত্যন্ত অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে বড় হতে হয়েছে তাকে। পরিবারকে সাহায্য করতে মাত্র তেরো বছর বয়সে চলচ্চিত্রে কাজের পাশাপাশি রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং কিংবা পোস্টার আঁকার কাজ করতেন তিনি। পেটের তাগিদে এবং শিক্ষার খরচ চালাতে বহু রাত না খেয়ে কাটানো এই তরুণ হয়তো নিজেও জানতেন না যে, একদিন এই জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতাগুলোই তাকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা ও বাস্তবিক অভিনেতা হিসেবে গড়ে তুলবে।
মুম্বাইয়ের স্যার জেজে স্কুল অব আর্টস থেকে কমার্শিয়াল আর্টসে পড়াশোনা করার পর তার ভেতরের নাট্যপ্রেম তাকে টেনে নিয়ে যায় থিয়েটারের মঞ্চে। থিয়েটারের সুশৃঙ্খল মঞ্চই ছিল নানার অভিনয়ের আসল ভিত্তিশিলা। এরপর ১৯৭৮ সালে ‘গমনের’ মাধ্যমে বড় পর্দায় পদার্পণ করলেও ১৯৮৯ সালের চলচ্চিত্র ‘পরিিন্দা’ দিয়ে তিনি বলিউডের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। এই ছবিতে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন ‘আন্না শেঠ’-এর চরিত্রে তার অভিনয় সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। তীব্র উন্মাদনা, ক্ষোভ আর রহস্যের সংমিশ্রণে গড়ে তোলা সেই চরিত্রের মাধ্যমে তিনি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
নানা পাটেকরের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার সততা। তিনি কোনো ছকবাঁধা অভিনয়ের ধার ধারেন না। ‘ক্রান্তিবীর’ ছবিতে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে সমাজ ও রাজনীতির বিরুদ্ধে তার আগুনঝরা বক্তব্য আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আবার অন্যদিকে ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ ছবিতে এক মুখ ও বধির বাবার চরিত্রে তার বাকহীন অথচ আবেগঘন অভিনয় দর্শকের চোখের কোণে জল এনে দিয়েছিল। অন্যদিকে ‘ওয়েলকাম’ সিরিজের ‘উদয় শেঠি’ চরিত্রটির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, গম্ভীর নাটকের পাশাপাশি কমেডি ঘরানাতেও তিনি সমান পারদর্শী। গম্ভীর কিংবা রসাত্মক যেকোনো চরিত্রকেই নিমিষে জীবন্ত করে তোলার অদ্ভুত এক জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে তার।
তবে পর্দার এই শক্তিশালী অভিনেতার সবচেয়ে সুন্দর রূপটি দেখা যায় বাস্তব জীবনের সাধারণ ক্যানভাসে। কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া সত্ত্বেও নানা অত্যন্ত সাধারণ ও সাদাসিধে জীবনযাপন করতে পছন্দ করেন। কোনো স্বর্গীয় প্রাসাদে নয়, বরং মুম্বাইয়ের একটি সাধারণ এক কামরার ফ্ল্যাটে দীর্ঘকাল কাটিয়েছেন তিনি। তার জীবনের আসল পরিচয় ফুটে ওঠে তার সমাজসেবামূলক কাজে। মহারাষ্ট্রের খরা পীড়িত কৃষকদের দুর্দশা দেখে তিনি স্থির থাকতে পারেননি। ‘নাম ফাউন্ডেশন’ নামক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে তিনি অভাবগ্রস্ত ও আত্মহত্যা করা কৃষকদের পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ান, তাদের আর্থিক সাহায্য করেন এবং গ্রামে গ্রামে পানির ব্যবস্থা করে দেন। নিজের উপার্জিত অর্থের একটি বিশাল অংশ তিনি অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন প্রান্তিক মানুষদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।
জীবনকে একদম কাছ থেকে দেখেছেন বলেই নানা পাটেকরের প্রতিটি ভাবনায় ফুটে ওঠে গভীর জীবনমুখী দর্শন। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার জাঁকজমকপূর্ণ পোশাকে বা ব্যাংক ব্যালেন্সে নয়, বরং তার কাজ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসায়। পর্দার আলো-ঝলমলে জগৎ ছেড়ে দিনশেষে তিনি সেই মাটির মানুষটিই হয়ে থাকেন, যিনি নিজের শিকড়কে কখনোই ভুলে যাননি। নানা পাটেকর তাই কেবল এক চমৎকার অভিনেতা বা বিনোদনের উৎস নন, বরং নিজের সংগ্রাম, মানবিকতা ও সাধারণ জীবনযাপনের মাধ্যমে তিনি অনেকের জীবনের অনুপ্রেরণার অন্য নাম।