Tuesday 13 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রিয়াদে হুতিদের হামলা / একের পর এক বাতিল সৌদিগামী ফ্লাইট, বিপাকে বাংলাদেশি কর্মীরা

মেহেদী হাসান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৩ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৫৪ | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ২১:৩২

বিমানবন্দরে ফ্লাইটের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সাম্প্রতিক হামলা ও নিরাপত্তা উদ্বেগের জের ধরে সৌদিগামী বিভিন্ন বিমান সংস্থার ফ্লাইট একের পর এক বাতিল করা হচ্ছে। এতে চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী। কারও ভিসার মেয়াদ শেষ পর্যায়ে, কারও আবার ছুটির শেষ দিন ঘনিয়ে আসছে— এমন পরিস্থিতিতে বিমানবন্দরগুলোতে জড়ো হয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা। নির্দিষ্ট সময় সৌদিতে প্রবেশ করতে না পারলে হারাতে হতে পারে স্বপ্নের চাকরি।

বর্তমান পরিস্থিতি ও এয়ারলাইন্সগুলোর সিদ্ধান্ত

রিয়াদে হামলার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক বিমান সংস্থাগুলো তাদের ফ্লাইট সূচিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সবশেষ তথ্যানুযায়ী, এখন পর্যন্ত সরাসরি ও ট্রানজিট মিলিয়ে মোট ৮২টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি সরাসরি এবং ৫০টি ট্রানজিট ফ্লাইট রয়েছে। সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১০টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি, সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ৫টি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের ৭টি ফ্লাইট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে ট্রানজিট ফ্লাইটগুলোর মধ্যে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের ২২টি, সালাম এয়ারের ৪টি, ইজিপ্ট এয়ারের ১টি, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ১১টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৬টি এবং ফ্লাই দুবাইয়ের ৬টি ফ্লাইট প্রভাবিত হয়েছে। আর এসব ফ্লাইট বাতিল ও ব্যাহত হওয়ার ফলে ১৩ হাজার দুইশ ৭১ জন বিমানযাত্রী চরম অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির মুখে পড়েছেন।

বিজ্ঞাপন

শঙ্কায় প্রবাসীদের কর্মজীবন ও ভিসা

বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য এ পরিস্থিতি এক বিশাল আর্থিক ও মানসিক ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবাসীদের মূল দুশ্চিন্তার জায়গাগুলো হলো- ইকামা ও ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণের ভয়, অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতি ও কফিল বা নিয়োগকর্তার চাপ।

ছুটির মেয়াদ বা নতুন ভিসার মেয়াদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে পৌঁছাতে না পারলে অনেকেরই চাকরি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। সেইসঙ্গে ঢাকা এসে হোটেল ভাড়া, নতুন টিকিট কেনা কিংবা বর্তমান টিকিটের তারিখ পরিবর্তনের বাড়তি খরচ বহন করতে গিয়ে প্রবাসীদের জমানো টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া, সৌদি আরবে নির্দিষ্ট সময়ে কাজে যোগ না দিলে নিয়োগকর্তারা (কফিল) অন্য কর্মী নিয়োগ করতে পারেন বা চুক্তি বাতিল করতে পারেন।

ফেনী থেকে এসেছেন মোহাম্মদ রাব্বি। তিনি সারাবাংলাকে জানান, দুপুর ২টায় বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইটে দাম্মাম যাওয়ার কথা। বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন ফ্লাইটটি বতিল করা হয়েছে। ভিসার মেয়াদ ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত, এর মধ্যে না যেতে পারলে সৌদিতে প্রবেশ সম্ভব হবে না।

শরীয়তপুর থেকে আসা ওমর ফারুক সারাবাংলা বলেন, আমার ছুটির মেয়াদ আর মাত্র তিন দিন বাকি আছে। আজ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় কী করব বুঝতে পারছি না। নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে না পারলে মালিক আমাকে আর কাজে নেবে না। আমরা সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ চাই।

ফেনী থেকে সকাল ৭টায় শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছান শুক্কুর মিয়া। উদ্দেশ্য ছিলো দাম্মাম গিয়ে চাকরিতে যোগ দেবেন। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় চাকরির অনিশ্চয়তার কথা জানান সারাবাংলাকে।

বিমান বন্দরে ফ্লাইটের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা – ছবি : সারাবাংলা

চট্টগ্রামের বাসিন্দা ফয়সাল মুবীন। তিনি সারাবাংলাকে জানান, অনেক কষ্ট করে ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন, কিন্তু এখন ফ্লাইট বাতিলে তার পুরো ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে, তাদের মতো ছুটিতে দেশে আসা হাজার হাজার কর্মী কাজে ফিরতে পারছেন না। যাত্রা পিছিয়ে যাওয়ায় তাদের ভিসার মেয়াদ ও চাকরি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে দেশের শ্রমবাজারে নতুন ধাক্কা।

কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এয়ারলাইন্সগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।

বিমান সংস্থাগুলো জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া মাত্রই বিশেষ বা অতিরিক্ত ফ্লাইটের মাধ্যমে জমে থাকা যাত্রীদের পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদ উল আলম সারাবাংলাকে বলেন, ঝুঁকি এড়াতে বর্তমান পরিস্থিতি মেনে নিতে হবে। তবে শ্রমবাজার টিকিয়ে রাখতে দুদেশের কূটনীতিক আলোচনার মাধ্যমে কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো উচিত। কিং খালিদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত রিয়াদগামী ৬১টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে সিডিউল বিপর্যয় হয়েছে দাম্মে কিং ফাহাদগামী বিমানের। এমন পরিস্থিতি ঝুঁকি এড়াতে ফ্লাইট স্থগিত মেনে নিতে হবে। তবে সৌদি সরকারের সাথে কূটনীতিক আলোচনার মাধ্যমে ভিসার মেয়াদ বাড়ানো উচিত।

সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট চলাচলে সৃষ্ট চরম অনিশ্চয়তা ও অচলাবস্থায় সৌদিগামী সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট পরিচালনাকারী সব এয়ারলাইন্সকে বিশেষ ও জরুরি সতর্কতামূলক নির্দেশনা পাঠিয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। আর এসব বাধ্যতামূলকভাবে মানার জন্য জোর দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনা হলো- কোনো ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব বা সময়সূচি পরিবর্তিত হলে তা সঙ্গে সঙ্গে এসএএমএস, ফোন কল, ইমেইল, ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যাত্রীদের জানাতে হবে। টিকিটের নতুন সময়, তারিখ পরিবর্তন, টিকিট ফেরত ও ফ্লাইট সংক্রান্ত তথ্যের বিষয়ে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা নিশ্চিত করতে হবে। ফ্লাইট নিশ্চিত হওয়া ছাড়া কোনো অবস্থাতেই যেন যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসার পরামর্শ না দেওয়া হয়। যেসব প্রবাসীর ভিসা ও অন্যান্য ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত তথ্যের মেয়াদ বাড়ানো প্রয়োজন, এয়ারলাইন্সগুলো তাদেরকে সৌদি কর্তৃপক্ষ, ঢাকায় অবস্থিত সৌদি এম্বাসি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সাথে যোগাযোগে প্রয়োজনীয় সহায়তার দিকনির্দেশনা দেবে।

এছাড়া, নোটিফিকেশন না পাওয়া বা পরিস্থিতি না জানার কারণে যেসব যাত্রী এরই মধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন বা পৌঁছাবেন, তাদের জন্য বসার সুব্যবস্থা, খাওয়ার পানি, নাশতা এবং খাবারের পূর্ণ ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রবীণ, শিশু ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সকে জরুরি ভিত্তিতে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘ফোকাল পয়েন্ট’ এবং প্রয়োজনীয় সহকারী দল নিয়োগ করতে হবে এবং ওই ফোকাল পয়েন্টের নাম, পদবি ও যোগাযোগের নম্বর বিমানবন্দর ফ্লাইট ম্যানেজমেন্টকে দ্রুত জানাতে হবে ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই যেন কোনো যাত্রী অবহেলিত বা হয়রানির শিকার না হন। যাত্রীদের সঙ্গে অত্যন্ত সহানুভূতি ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে আচরণ নিশ্চিত করার কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে সকল এয়ারলাইন্সকে এই নির্দেশনা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে এবং শাহজালাল বিমানবন্দর ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সার্বক্ষণিক নিবিড় সমন্বয় রক্ষা করতে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, বিদেশে থাকা আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি- প্রবাসী কর্মীদের এ সংকট থেকে উত্তরণে দ্রুত সরকারি উদ্যোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন। আটকে পড়া কর্মীদের আকুল আবেদন, যেন দ্রুত নিরাপত্তা স্বাভাবিক করে বা বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের সৌদি আরবে পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।

উল্লেখ্য, টানা তৃতীয় দিনের মতো সোমবার (১২ অক্টোবর) সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। হুতিদের ছোড়া এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করছে ইয়েমেনে যুদ্ধরত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এমন এক সময়ে নিক্ষেপ করা হয়েছে যখন সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় শহরটি বিপর্যস্ত। তার আগে, গত ১০ অক্টোবর হুতিদের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হওয়ার পর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি বন্ধ রয়েছে। ঠিক এমন পরিস্থিতিতেই নতুন করে এসব হামলার ঘটনা ঘটল। ১১ অক্টোবর চালানো আরেকটি হামলায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর