Sunday 01 November 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

দৃষ্টিহীনের দীপ্তিময় জয় / এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করে মৌমির চমক

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১ নভেম্বর ২০২৬ ১৭:৪৮ | আপডেট: ১ নভেম্বর ২০২৬ ১৯:১৮

পিতা-মাতার সঙ্গে তাহমিনা আক্তার মৌমি। ছবি: সংগৃহীত

সিলেট: চোখের সামনে পৃথিবীর কোনো রূপ, রঙ বা আলোর অস্তিত্ব নেই; চারপাশজুড়ে বিছিয়ে রাখা শুধুই নিরেট অন্ধকারের চাদর। কিন্তু সেই ঘন আঁধার কখনোই দমিয়ে রাখতে পারেনি তাহমিনা আক্তার মৌমির ভেতরের অদম্য শিখাকে। দৃষ্টির সীমাবদ্ধতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মনের গভীরের আত্মবিশ্বাস, কঠোর অধ্যবসায় আর মেধার দ্যুতিতে আলো ছড়ালেন তিনি।

এবারের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় সিলেট শিক্ষা বোর্ডে যখন সামগ্রিক ফলাফলে নেমে এসেছে বড় ধরনের বিপর্যয়—অর্ধেক শিক্ষার্থী যেখানে কৃতকার্য হতে পারেনি এবং উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা— সেই চরম খরা ও হতাশার মাঝেও অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন মৌমি। ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সিলেট সরকারি মদন মোহন কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে অংশ নিয়ে তিনি ছিনিয়ে এনেছেন সর্বোচ্চ ফলাফল, কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫।

বিজ্ঞাপন

মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের মানিশিং গ্রামে এক সাধারণ পরিবারে মৌমির বেড়ে ওঠা। বাবা আব্দুল আহাদ ও মা আমিনা আক্তার পুষ্প দম্পতির এই কন্যা জন্ম থেকেই চোখের আলোহীন। সমাজে যেখানে প্রতিবন্ধকতাকে এখনও করুণা বা বোঝা হিসেবে দেখার মানসিকতা বিদ্যমান, সেখানে মৌমির পরিবার ও তিনি নিজে কখনোই এই সীমাবদ্ধতাকে ভাগ্যের নির্মম পরিণতি বলে মেনে নেননি। বরং, ছোটবেলা থেকেই তার চোখে ছিল স্বনির্ভর হওয়ার এবং সমাজের মূলধারায় মেধার জোরে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার স্বপ্ন।

মৌমির এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ দেড় দশকের এক নীরব সাধনা, কান্না আর ঘামের ইতিহাস। একদম প্রথম শ্রেণি থেকেই তিনি সিলেটে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন ও শিক্ষার ক্ষেত্রে নিবেদিতভাবে কাজ করা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘গ্রিন ডিসএবেল্ড ফাউন্ডেশন’ (জিডিএফ)-এর আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে বেড়ে ওঠেন। নিজের পরিবার-পরিজন ছেড়ে প্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালের ভেতর থেকে স্পর্শের ভাষা ব্রেইল পদ্ধতি এবং অডিও রেকর্ডিং শুনে শুনে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি। সাধারণ একটি পাঠ মুখস্থ করতে বা বুঝতে একজন স্বাভাবিক শিক্ষার্থীর চেয়ে তাকে দিতে হয়েছে দ্বিগুণ-তিনগুণ শ্রম। রাতের পর রাত জেগে অডিও ফাইলে শিক্ষকের বক্তব্য শুনে তা স্মৃতির মণিকোঠায় ধারণ করেছেন মৌমি।

মৌমির এই অনন্য কৃতিত্বে পুরো জিডিএফ পরিবারে বইছে আনন্দ ও গর্বের জোয়ার। গ্রিন ডিসএবেল্ড ফাউন্ডেশন’ (জিডিএফ)-এর নির্বাহী পরিচালক বায়েজিদ আহমদ খান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, ছোটবেলা থেকে মৌমির মধ্যে যে অসম্ভব জানার আগ্রহ ও মেধার স্পষ্টতা দেখা গেছে, তা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রতিকূল পরিস্থিতি যে একাগ্রতার কাছে হার মানতে বাধ্য, মৌমির এই ফলাফল তারই প্রমাণ।

তিনি আরও বলেন, ‘​আমাদের স্বপ্ন ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর। ভর্তি পরীক্ষার জন্য এরই মধ্যে তাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।’

নিজের সফলতাকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের উৎসর্গ করে তাহমিনা আক্তার মৌমি বলেন, ‘আমার এই যাত্রাপথে যারা পাশে থেকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাদেরসহ দেশবাসীকে উৎসর্গ করলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘শ্রুতি লেখক না পাওয়ায় পরীক্ষা দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। তখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর পরবর্তীতে সকলের সহযোগিতায় আমি এইচএসসি পরীক্ষা দিই।’

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মৌমি বলেন, ‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পিছিয়ে না থেকে সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। সেইসঙ্গে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মতো আমাদের পড়াশোনা করতে হবে। ছোট্ট বেলা থেকে আমার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে একজন আইনজীবী হওয়ার।’

তবে মৌমির এই সাফল্যের পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। এইচএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের পথে নানা প্রশাসনিক ও নিয়মতান্ত্রিক জটিলতা দেখা দিয়েছিল। পরীক্ষার দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে মানবিক দায়িত্ববোধ নিয়ে মৌমির পাশে এসে দাঁড়ান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরসহ কয়েকজন হৃদয়বান ব্যক্তি। তাদের আন্তরিক সহমর্মিতা, দায়িত্বশীলতা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে দ্রুত প্রশাসনিক বাধা দূর হয় এবং মৌমির পরীক্ষায় নির্বিঘ্নে বসার পথ পুরোপুরি সুগম হয়।

একইসঙ্গে মানবিক ও সহযোগিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পাশে এসে দাঁড়ায় সিলেট শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি মদন মোহন কলেজ প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট সবার এই সম্মিলিত সহায়তা মৌমির লড়াইয়ের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

পরীক্ষার হলে মৌমির ভাবনার বিশ্বস্ত সারথি ও হাত হিসেবে কাজ করেছেন শ্রুতিলেখক পল্লব রায়। হাজী আব্দুস সাত্তার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সদ্য এসএসসি পাস করা পল্লব পরীক্ষার দিনগুলোতে নিজের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ঢেলে দিয়েছেন। মৌমির স্মৃতিতে থাকা তথ্যগুলো যখন তিনি মুখে উচ্চারণ করতেন, তখন অত্যন্ত দ্রুততা, যত্ন ও নির্ভুল বানানে তা উত্তরপত্রে তুলে ধরতেন পল্লব। মৌমির মস্তিষ্কের গভীর জ্ঞান আর পল্লবের কলমের দ্রুততার এই অপূর্ব মেলবন্ধনই প্রতিটি বিষয়ে চমৎকার নম্বর অর্জনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

তাহমিনা আক্তার মৌমির এই সাফল্য কেবল একটি চমৎকার রেজাল্ট কার্ড বা ব্যক্তিগত একাডেমিক স্বীকৃতি নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য এক অনন্য বার্তা হিসেবে দেখছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, সমাজের একটু সহমর্মিতা ও সঠিক সুযোগ পেলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে যেকোনো শিক্ষার্থীই সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর