একটি দেশে যখন ডেঙ্গুতে প্রতিদিন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, হাজার হাজার মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তখন সেই রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত নরমাল স্যালাইনই যদি বাজারে পাওয়া না যায়, এর চেয়ে উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি আর কী হতে পারে? মানুষ অসুস্থ হবে, হাসপাতালে যাবে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেবে, অথচ প্রয়োজনীয় একটি মৌলিক চিকিৎসা উপকরণ সংগ্রহ করতে গিয়ে তাকে এক ফার্মেসি থেকে অন্য ফার্মেসিতে ছুটতে হবে এ কেমন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা? ডেঙ্গুর প্রকোপের মধ্যে সারা দেশে নরমাল স্যালাইনের সংকট সাধারণ মানুষের চিকিৎসা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এটি শুধু বাজারে একটি পণ্যের ঘাটতি নয়, এটি মানুষের জীবন রক্ষার সঙ্গে জড়িত একটি গুরুতর জাতীয় প্রশ্ন।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ইতোমধ্যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১ নভেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২৭ জনে। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৯ জন। এর মধ্যে শুধু গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯২৯ জন এবং মারা গেছেন আটজন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬ হাজার ১১৪ জন। অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুতে ১৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি যে কতটা উদ্বেগজনক, তা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। নভেম্বরেও সংক্রমণ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এখনই কার্যকর প্রস্তুতি না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক কোনো রোগ নয়। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে, কোথাও শয্যাসংকট, কোথাও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সীমাবদ্ধতা। এমনকি নিজের হাসপাতালেও বেড না পাওয়ার মতো পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা হয়েছে। একজন অসুস্থ মানুষ যখন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে শয্যা পান না, এরপর প্রয়োজনীয় স্যালাইন সংগ্রহ করতেও বিড়ম্বনায় পড়েন, তখন তার স্বজনদের অসহায়ত্ব কতটা গভীর হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। সেখানে চিকিৎসার উপকরণই যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, নরমাল স্যালাইনের মতো একটি অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট তৈরি হলো কেন? বাংলাদেশে ওষুধশিল্প যথেষ্ট বিকশিত হয়েছে। দেশের উৎপাদিত ওষুধ বিশ্বের প্রায় ১৪০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। অথচ দেশের মানুষ একটি সাধারণ তরল স্যালাইন কিনতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়বে, এটি বিস্ময়কর। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তরল স্যালাইনের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কয়েকটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে নরমাল স্যালাইনের নির্ধারিত খুচরা মূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে। উৎপাদকদের দাবি, বর্তমানে একটি ব্যাগ স্যালাইন উৎপাদনে প্রায় ১২০ টাকা ব্যয় হলেও নির্ধারিত বিক্রয়মূল্য ৮৭ টাকা। মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাবও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। উৎপাদনকারীদের বক্তব্যে সমস্যার একটি কারণ উঠে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সমস্যার সমাধান করতে এত দেরি কেন?
উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার বাস্তবতা সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। আবার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হলো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করে এমন একটি মূল্য ও সরবরাহনীতি নির্ধারণ করা, যাতে কোম্পানিগুলো উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে না ফেলে এবং সাধারণ মানুষও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির শিকার না হয়। কিন্তু বাজারে সংকট তৈরি হওয়ার পরও যদি সিদ্ধান্তহীনতা চলতে থাকে, তাহলে তার দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে। মানুষের জীবন রক্ষার উপকরণ নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এখানে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কয়েকটি সরাসরি প্রশ্ন রাখতে চাই। দেশে নরমাল স্যালাইনের প্রকৃত চাহিদা কত? প্রতিদিন কত ব্যাগ উৎপাদিত হচ্ছে? সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কী পরিমাণ মজুত রয়েছে? কোন কোন প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়েছে বা বন্ধ রেখেছে? কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? জরুরি প্রয়োজনে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি? এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। শুধু আশ্বাস দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় নরমাল স্যালাইন গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রত্যেক রোগীর শিরায় স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। রোগীর শারীরিক অবস্থা, পানিশূন্যতা, রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন। অতিরিক্ত স্যালাইনও ডেঙ্গু রোগীর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই আতঙ্কিত হয়ে নিজেরা স্যালাইন প্রয়োগ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। তবে চিকিৎসকের প্রয়োজনীয় পরামর্শ অনুযায়ী স্যালাইন দিতে গিয়ে রোগীকে যেন বাজারে তা খুঁজে বেড়াতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমাদের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতার অভাব। প্রতিবছর বর্ষা এলেই মশকনিধন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বছরের বাকি সময় এ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা কোথায়? বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জায়গা, ড্রেন, নালা এবং জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার না করলে এডিস মশার বিস্তার ঠেকানো কঠিন। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু অভিযাননির্ভর কার্যক্রম থেকে বেরিয়ে এসে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকদেরও নিজেদের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিতে হবে।
এ মুহূর্তে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত নরমাল স্যালাইনের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা। দেশের সব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা, কাঁচামালের মজুত এবং সরবরাহের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজন হলে জরুরি ভিত্তিতে আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত স্যালাইন মজুত রাখতে হবে। পাশাপাশি বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি কিংবা অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। স্যালাইনের দৈনিক উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, ডেঙ্গু মোকাবিলা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার দায়িত্ব নয়। এটি জাতীয় সমন্বিত উদ্যোগের বিষয়। স্বাস্থ্য বিভাগকে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হতে হবে, ওষুধ প্রশাসনকে বাজার তদারকি করতে হবে এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয় সংকটের সময় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে।
মানুষের জীবন কোনো ব্যবসায়িক হিসাবের বিষয় হতে পারে না। আবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব সমস্যাকেও অস্বীকার করে সমাধান পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন দায়িত্বশীল সমন্বয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর তদারকি। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত একজন রোগীর স্বজন যখন হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় স্যালাইন খুঁজবেন, তখন রাষ্ট্রের কাছে তাঁর প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তিনি শুধু চান, প্রিয় মানুষটির চিকিৎসা যেন কোনো সরবরাহ সংকটে থেমে না যায়।
আজ তাই প্রশ্ন একটাই ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে মানুষকে কি আবার স্যালাইনের সংকটের সঙ্গেও লড়তে হবে? একটি সাধারণ চিকিৎসা উপকরণের অভাবে কোনো রোগী যেন চিকিৎসাবঞ্চিত না হন। সংকটের কারণ অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষের কাছে স্যালাইন কোনো বিলাসী পণ্য নয়, চিকিৎসার প্রয়োজনে এটি জীবন রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। মানুষের জীবন রক্ষার প্রশ্নে কোনো অজুহাত নয়, চাই দ্রুত সমাধান।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট