সিলেট: যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রায় নব্বই শতাংশই বৃহত্তর সিলেটের মাটি ও মানুষের সন্তান। শতাব্দী প্রাচীন সংগ্রাম, সততা, ঘাম ও চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে ব্রিটিশ মুলুকে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে এই কমিউনিটি। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক বাংলা স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল এস-এর প্রতিষ্ঠাতা মাহী ফেরদৌস জলিলের (মাহি জলিল) এক বিতর্কিত মন্তব্য সেই আত্মমর্যাদায় চরম আঘাত হেনেছে। ভিসা জালিয়াতি ও যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের প্রসঙ্গ টানতে গিয়ে তিনি মন্তব্য করেন—‘লন্ডনে থাকার স্বপ্ন পূরণে নিজের মাকেই বিয়ে করতে দ্বিধা করে না ছেলে!’
একজন প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের মুখ থেকে এমন বিতর্কিত মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে লন্ডন-সিলেট কমিউনিটিতে।
দেশ-বিদেশের সচেতন মহল, বুদ্ধিজীবী, প্রবাসী কমিউনিটি লিডার এবং সাধারণ মানুষ একে পুরো সিলেটি সমাজের বিরুদ্ধে জঘন্যতম কুৎসা ও চরিত্রহননের অপচেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, কোটি মানুষের মাঝে বিচ্ছিন্নভাবে হয়তো কালেভদ্রে কোনো অস্বাভাবিক অপরাধ ঘটে থাকতে পারে, কিন্তু সেই বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রমকে ঢালাওভাবে উপস্থাপন করে পুরো সিলেটবাসীর কপালে এমন অপবাদ লেপন কোনো দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের কাজ হতে পারে না।
শতবর্ষের গৌরবময় ঐতিহ্যে কালিমালিপ্ত করার ধৃষ্টতা
সিলেটের মানুষ যুক্তরাজ্যে কোনো করুণা নিয়ে পা রাখেনি। সেই অষ্টাদশ শতকের লস্করদের জাহাজ চালানো থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে ব্রিটিশ অর্থনীতি পুনর্গঠনে সিলেটের শ্রমজীবী মানুষের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। রেস্তোরাঁ শিল্প থেকে শুরু করে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট, স্থানীয় সরকার, আধুনিক চিকিৎসা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিরা আজ শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যে প্রায় প্রতিটি সিলেটি পরিবার তাদের সামাজিক অনুশাসন, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং পারিবারিক শ্রদ্ধাবোধের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। সেখানে মা-ছেলের মতো পরম পবিত্র ও রক্তের সম্পর্ককে যুক্তরাজ্যে বসবাসের সস্তা সনদের সাথে তুলনা করে যে কদর্য ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা শুধু সিলেটিদের জন্য নয়, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য চরম লজ্জাজনক। কমিউনিটি বিশ্লেষকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া কিংবা সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভে এমন অপ্রীতিকর শব্দচয়ন এক ধরনের সামাজিক ও মানসিক বিকৃতিরই বহিঃপ্রকাশ।
বিচ্ছিন্ন অপরাধকে ঢালাও সাধারণিকরণ প্রশ্নবিদ্ধ সাংবাদিকতা
আইন ও সমাজবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মানুযায়ী, অপরাধীর কোনো সুনির্দিষ্ট অঞ্চল বা গোষ্ঠীগত পরিচয় হয় না। ইউরোপ বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশে যেখানে লক্ষাধিক অভিবাসী বসবাস করেন, সেখানে আইনের ফাঁকফোকর গলে কেউ কোনো অনৈতিক পন্থা বেছে নিলে সেটির বিচার ব্রিটিশ হোম অফিস এবং যুক্তরাজ্যের বিচার ব্যবস্থার অধীনে হয়ে থাকে।
কিন্তু সেই কালেভদ্রে ঘটা দু-একটি অস্বাভাবিক অপরাধমূলক উদাহরণকে সাধারণ রূপ দিয়ে জনসমক্ষে এমনভাবে উপস্থাপন করা হলো যেন এটি সিলেটের মানুষের নিয়ত চর্চা! দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নৈতিক মূলনীতি বলে—কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে কলঙ্কিত বা ‘স্টিরিওটাইপ’ করা গুরুতর পেশাগত অপরাধ। অথচ চ্যানেল এস-এর মতো একটি প্ল্যাটফর্মের শীর্ষ পদে থেকেও মাহি জলিল নিজের জন্মমাটিকে আন্তর্জাতিক মহলে এভাবে খাটো করলেন। স্থানীয় সুশীল সমাজ বলছেন, তিনি ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা চমক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পুরো কমিউনিটির মর্যাদা ব্রিটিশ সমাজে ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন।
মাহি জলিলের অতীত নিয়ে তোলপাড়
মাহি জলিলের এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্যের পর তাঁর নিজের অতীত ইতিহাস ও নৈতিক অবস্থান নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। ব্রিটিশ ক্রাউন কোর্টের নথিপত্র এবং সংবাদমাধ্যমের তথ্য টেনে অনেকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন তাঁর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কথা।
উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্যে গাড়ি বীমা জালিয়াতি (যা কুখ্যাত ‘ক্র্যাশ-ফর-ক্যাশ’ স্ক্যাম নামে পরিচিত) এবং মানি লন্ডারিংয়ের মতো গুরুতর আর্থিক অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে ২০০৮ সালে ক্রয়েডন ক্রাউন কোর্ট মাহি জলিলকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিল। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএ) ১৯তম অ্যাওয়ার্ডসহ নানা বিষয় নিয়ে তাঁর আগ্রাসী মন্তব্য কমিউনিটিতে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
প্রবাসী কমিউনিটির একাধিক বিশ্লেষক বলছেন, যিনি নিজেই অতীতে যুক্তরাজ্যের আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁর মুখে পুরো একটি সম্প্রদায়ের চরিত্র নিয়ে এমন কদর্য নীতিবাক্য বা অপবাদ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিজের অতীত অপকর্মের দায় না নিয়ে সাধারণ প্রবাসী ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করাকে ‘দ্বিমুখী নীতি’ বলে মন্তব্য করছেন সুধীজন।
ক্ষোভে ফুঁসছে সিলেট ও প্রবাসী সমাজ
মাহি জলিলের এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সিলেটে একের পর এক সামাজিক সংগঠন, ছাত্রসংগঠন ও প্রবাসী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ কঠোর বিবৃতি দিতে শুরু করেছে। লন্ডনের বিভিন্ন বারার বাঙালি কমিউনিটি সেন্টারে জরুরি সভা ডেকে তাঁর এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
লন্ডনের বিশিষ্ট এক কমিউনিটি নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা যুক্তরাজ্যে মাথা উঁচু করে বাস করি। আমাদের নতুন প্রজন্ম মূলধারার রাজনীতি ও করপোরেট সেক্টরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে। এই সময়ে মাহি জলিল মা ও ছেলের পবিত্র সম্পর্ককে টেনে যে নোংরা উদাহরণ দিলেন, তাতে করে স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ বা আন্তর্জাতিক সমাজের সামনে আমাদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হলো। একজন বিকৃত মানসিকতার লোক ছাড়া কেউ নিজের স্বজাতির বিরুদ্ধে এমন কথা বলতে পারে না।”
একইভাবে সিলেটের রাজপথেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সিলেটের বিশিষ্ট লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, কোনো অঞ্চলের মানুষেরই এমন ভাষা পাওয়ার কথা নয়। তিনি যা বলেছেন, তা কোনো সচেতন বা মানসিক ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তির বক্তব্য হতে পারে না।
বাচিক শিল্পী ও কবি ‘সালেহ আহমেদ খসরু সারাবাংলার প্রতিবেদকের সাথে ক্ষোভের সুরে বলেন, বিগত বিশ বছর ধরে প্রত্যক্ষ করেছি–যে যেখানে থাকার কথা সে-সেখানে নেই। মাহি জলিল তাদেরই একজন। যেখানে সে থাকার কথা ছিলো না, সেখানে সে এসেছে এবং মিডিয়া পাড়ার কিছু মানুষরাই তাকে মাহি জলিল বানিয়েছে।
সুতরাং দায়টা শুধু মাহি জলিলের না, যারা তাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে তাদেরও দায় আছে। সিলেট নিয়ে যে এরকম কথা বলে তার মতো করে আমি অশালীন কোনো শব্দ ব্যবহার করবো না। তবে তার জন্মের যদি সূত্র খুঁজতে যাই, দেখা যাবে হয়তো তার জন্মটা এরকম কোনো জায়গা থেকে হয়েছে। এসব ঘটনার জন্য আমি একজন সিলেটী হিসেবে ক্ষোভ প্রকাশ করবো না! আমি সিলেটীদেরকে বলবো–এরকম সিলেটীকে বয়কট করুন। আর ভবিষ্যতে যাতে আরো ভালো সিলেটী হিসেবে গড়ে উঠে নিজের সন্তানকে সেভাবে মানুষ করুন।
এর আগেও তিনি চ্যানেল এস-এ সরাসরি সম্প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে উপস্থাপক হয়ে – বিলেতে কথিপয় বাঙালি ব্যবসায়ীদের শরীরে হিন্দুত্ববাদের রক্ত বহমান (কমজাত রক্ত) উল্লেখ করে সাম্প্রদায়িক ও কটুক্তিমূলক মন্তব্য করে কমিউনিটিতে তুমুল সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছেন। তখন চ্যানেল এস থেকে বহিস্কারের দাবিও জানিয়েছিল ‘আ্যলায়েন্স আ্যগেইনস্ট রেইসিজম আ্যন্ড রেলিজিয়াস হেইট্রেড’ নামের একটি সংগঠন।
শুধু তাই নয়, তিনি চ্যানেল এস ইউকের একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়া ও নোবেল বিজয়ী ডক্টর ইউনুসকে নিয়েও বিভিন্ন সময় নেতিবাচক মন্তব্য করে সমালোচিত হয়েছেন।
গণমাধ্যমে রুচির দুর্ভিক্ষ ও বর্জনের ডাক
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলস বা ভিডিওতে কোটি ভিউ ও ভিউয়ারশিপের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে অনেকেই আজ সামাজিক দায়বদ্ধতা বিসর্জন দিচ্ছেন। সিলেটি অডিয়েন্সকে পুঁজি করে চ্যানেল ও মিডিয়া ব্যবসা গড়ে তোলার পর, সেই সিলেটিদেরই এমন নগ্ন ভাষায় আক্রমণ করা চরম অকৃতজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
যুক্তরাজ্যের বহু দর্শক ও ব্যবসায়ী ইতিমধ্যে চ্যানেল এস ও মাহি জলিলের অনুষ্ঠান বর্জনের ডাক দিয়েছেন। একই সাথে সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে তাঁর পেজ এবং বক্তব্যকে ‘হেইট স্পিচ’ ও ‘মানহানিকর’ হিসেবে রিপোর্ট করার উদ্যোগ নিয়েছেন ক্ষুব্ধ প্রবাসীরা।
অবিলম্বে নিঃশর্ত ক্ষমার দাবি
সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজ ও বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের দাবি একটাই—মাহি জলিলকে তার এই চরম আপত্তিকর, অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। শুধু প্রত্যাহারই নয়, লাইভ অনুষ্ঠানে এসে পুরো সিলেটবাসী এবং বৈশ্বিক বাঙালি কমিউনিটির কাছে প্রকাশ্য ও নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।
একটি সমাজের শতবর্ষের গৌরবোজ্জ্বল রক্ত-ঘামের অর্জনকে ব্যক্তিগত চমক সৃষ্টির হাতিয়ার বানিয়ে বিনষ্ট করার অধিকার কারও নেই। নিজের অপরাধমূলক অতীত ঢেকে রাখতে গিয়ে যদি কেউ পুরো সিলেটবাসীর আত্মসম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অপচেষ্টা চালায়, তবে সেই চক্রান্ত রুখে দিতে বিশ্বজুড়ে সিলেটিরা আজ একতাবদ্ধ।