কুমিল্লা: সবুজে ঘেরা কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার বানাশুয়া গ্রাম। এখানেই প্রায় দুই একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে মদিনা অ্যাগ্রো ফার্ম। মাছের পুকুর, গরুর খামার আর লেয়ার মুরগির ফার্ম, সব মিলিয়ে এক সমন্বিত কৃষি উদ্যোগ। শখের বসে ২০২১ সালে এই খামার গড়ে তোলেন উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আলী নয়ন। এখন প্রতিদিন এখান থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে দুধ ও ডিম। পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থানেরও।
গরুর দুধ ও মুরগির ডিম ছাড়াও গরুর গোবর ও মুরগির বিষ্ঠা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে দেওয়া হয়। এর পর প্রাকৃতিকভাবে পচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় গ্যাস। পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই গ্যাস পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে নির্দিষ্ট পরিবারের রান্নাঘরে।
একসময় খামারের গোবর আর মুরগির বিষ্ঠা ছিল ঝামেলার কারণ। খামারে জমে থাকা এসব বর্জ্য থেকে ছড়াত দুর্গন্ধ, বাড়ত পরিবেশ দূষণ। ফেলে দেওয়া ছাড়া এসব বর্জ্যের কোনো মূল্যই ছিল না। কিন্তু সেই চিত্র এখন বদলেছে। যে গোবর-বিষ্ঠা একসময় ছিল বর্জ্য, সেটিই এখন জ্বালানি।
কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় খামারের বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে বায়োগ্যাস। সেই গ্যাসেই রান্না হচ্ছে খামারের শ্রমিকদের খাবার। আবার এই বায়োগ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে আশপাশের গ্রামে। এতে একদিকে যেমন খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমাধান হচ্ছে, অন্যদিকে কমছে রান্নার জ্বালানি খরচ। সেই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে বাড়তি আয়ের সুযোগ।
মদিনা অ্যাগ্রো ফার্মের উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আলী নয়ন সারাবাংলাকে বলেন, ‘খামারে প্রতিদিন অনেক গোবর ও মুরগির বিষ্ঠা জমত। এগুলো পরিষ্কার করাও ছিল ঝামেলার বিষয়। পরে চিন্তা করলাম, এই বর্জ্য যদি কাজে লাগানো যায় তাহলে একসঙ্গে দুইটা সুবিধা পাওয়া যাবে। সেই চিন্তা থেকেই বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করা। এখন খামারের রান্নার কাজ মেটানোর পাশাপাশি আশপাশের ৪০টি পরিবারও এখান থেকে গ্যাস পাচ্ছে। এতে আমার যেমন উপকার হচ্ছে, তেমনি গ্রামের মানুষেরও উপকার হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে যে জিনিসটা ফেলে দিতে হতো, এখন সেটাই আমাদের কাজে লাগছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাও কমেছে, আবার জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করতে পারছি। অন্য খামারিরাও চাইলে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারেন।’
মদিনা অ্যাগ্রো ফার্মের উৎপাদিত বায়োগ্যাস এখন শুধু খামারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্রামের ৪০টি পরিবারের রান্নার চুলায় পৌঁছে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে বিষয়টি যেমন নতুন, তেমনি স্বস্তিরও। কারণ, রান্নার জন্য প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি হাতের কাছেই পাওয়া যাচ্ছে বিকল্প জ্বালানি।
বায়োগ্যাসে রান্না করা গৃহিণী মাহফুজা মুক্তা সারাবাংলাকে বলেন, ‘বায়োগ্যাস দিয়ে রান্না করতে আমাদের বেশ সুবিধা হচ্ছে। রান্নার জন্য আলাদা করে জ্বালানি নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। চুলায় গ্যাস থাকায় প্রয়োজনমতো রান্না করা যায়। সবচেয়ে ভালো লাগছে, যে গোবর-বিষ্ঠা আগে পরিবেশের জন্য সমস্যা ছিল, এখন সেটাই আমাদের রান্নার কাজে লাগছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এভাবে যদি আরও বেশি এলাকায় বায়োগ্যাসের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে গ্রামের অনেক পরিবারের রান্নার খরচ ও জ্বালানি নিয়ে চিন্তা কমবে।’
বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের কারণে শুধু জ্বালানিই মিলছে না, খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সহজ হয়েছে। প্রতিদিনের গোবর ও মুরগির বিষ্ঠা নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গিয়ে প্ল্যান্টে দেওয়া হচ্ছে। ফলে খামারের চারপাশে বর্জ্য জমে থাকার প্রবণতা কমেছে।
মদিনা অ্যাগ্রোর কর্মচারী রাকিব সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগে খামারের গোবর-বিষ্ঠা পরিষ্কার করে অন্য জায়গায় রাখতে হতো। এখন নিয়ম করে সেগুলো প্লান্টে দেওয়া হয়। কাজটা খুব কঠিন না। বরং, আগে যেখানে বর্জ্য সরানোর জন্য বাড়তি ঝামেলা ছিল, এখন সেটা একটা কাজে ব্যবহার হচ্ছে। এখন বুঝতে পারছি, খামারের বর্জ্য আসলে ফেলে দেওয়ার জিনিস না। সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটা অনেক কাজে লাগে।’
মদিনা অ্যাগ্রো ফার্মের বায়োগ্যাস প্লান্ট দেখতে প্রতিদিনই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন। খামারি ও সাধারণ মানুষ জানতে চাইছেন, কীভাবে গোবর ও মুরগির বিষ্ঠা থেকে গ্যাস তৈরি হচ্ছে, কতটা খরচ হচ্ছে এবং কীভাবে সেই গ্যাস মানুষের বাড়িতে সরবরাহ করা হচ্ছে।
খামার দেখতে আসা আনোয়ার হোসাইন সারাবাংলাকে বলেন, ‘এখানে এসে বিষয়টি দেখে ভালো লেগেছে। আমরা সাধারণত গোবর ও মুরগির বিষ্ঠাকে বর্জ্য হিসেবেই দেখি। কিন্তু এগুলো থেকেই যে রান্নার গ্যাস তৈরি করা যায়, সেটা এখানে এসে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেসব এলাকায় গরু ও মুরগির খামার বেশি, সেখানে এ ধরনের প্ল্যান্ট করা গেলে একদিকে বর্জ্য কমবে, অন্যদিকে মানুষের জ্বালানির একটা ব্যবস্থা হবে। আমার মনে হয়, এ বিষয়ে মানুষকে আরও বেশি জানানো দরকার।’
কুমিল্লায় ব্যক্তি ও খামারভিত্তিক উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগেও বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করা হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুব উন্নয়ন অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে কুমিল্লা জেলায় ১১৭টি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্লান্টের মাধ্যমে কয়েক হাজার মানুষ গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছেন।
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. গোলাম আজম সারাবাংলাকে বলেন, ‘বায়োগ্যাসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এখানে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা যায়। গরু ও মুরগির খামার থেকে যে বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার করে গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব। এতে খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যেমন সহজ হয়, তেমনি বিকল্প জ্বালানিও পাওয়া যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ইমপ্যাক্ট-৩ প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরির বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, স্থানীয়ভাবে আরও বেশি উদ্যোক্তা তৈরি করা এবং মানুষকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত করা।’
যুব উন্নয়ন অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, ইমপ্যাক্ট-৩ প্রকল্পের মাধ্যমে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরির বিষয়ে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্ল্যান্ট পরিচালনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় ধারণা দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুমিল্লার মতো কৃষি ও খামারনির্ভর এলাকায় বায়োগ্যাসের সম্ভাবনা অনেক। কারণ, প্ল্যান্টের প্রধান কাঁচামাল গোবর ও মুরগির বিষ্ঠা স্থানীয়ভাবেই পাওয়া যায়। ফলে একদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হয়, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা যায় জ্বালানি।
জ্বালানি সংকট ও বাড়তি খরচের পাশাপাশি খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বায়োগ্যাস সেই দুই সমস্যার একটি সম্ভাবনাময় সমাধান হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।