Saturday 19 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মিনি আর্ট যখন আয়ের উৎস / ৩৫০ টাকা দিয়ে শুরু কাওছারের মাসিক আয় ১০-১২ হাজার

তাসলিমুল হাসান সিয়াম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:১৮

কাওছারের হাতে তৈরি মিনি আর্ট। ছবি: সারাবাংলা

গাইবান্ধা: কোথাও চায়ের দোকান, কোথাও মুদি দোকান, আবার কোথাও নীরব একটি পাঠাগার। আছে টিনের ঘর, পড়ার টেবিল-চেয়ার, বইয়ের তাক, লাল টেলিফোন বুথ, ডাকবাক্স, ফুলের টব ও পাখির বাসা। সবকিছুই যেন একেবারে বাস্তব।‎ দূর থেকে দেখলে মনে হবে, এ যেন গ্রামবাংলার কোনো ছোট্ট বাজার।

‎কিন্তু একটু কাছে গেলেই বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। কারণ, এগুলো কোনো বাস্তব স্থাপনা নয়; এক তরুণের নিপুণ হাতে তৈরি ক্ষুদ্রাকৃতির শিল্পকর্ম। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের কাওছার আলীর হাতে ক্ষুদ্র পরিসরে ফুটে উঠছে বাংলার চেনা গ্রামীণ জীবন, মানুষের স্মৃতি ও আবেগ।

‎সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কিশামত সর্বানন্দ গ্রামের তরুণ মো. কাওছার আলী। পড়াশোনা করছেন রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। পড়াশোনার পাশাপাশি শখের বসে শুরু করেছিলেন মিনি আর্ট তৈরি। সেই শখই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে তার পরিচয়, স্বপ্ন এবং আয়ের অন্যতম মাধ্যম।

‎কাঠ, হার্ডবোর্ড, কার্ডবোর্ড, কাগজ, প্লাস্টিক, আঠা ও রঙ সামান্য এসব উপকরণ দিয়েই কাওছার তৈরি করেন গ্রামবাংলার পরিচিত নানা দৃশ্যের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। একটি মুদি দোকানের তাক, ছোট্ট বেঞ্চ, দরজা-জানালা থেকে শুরু করে পণ্যের মোড়ক ‎কোনো কিছুই বাদ যায় না তার সুক্ষ্ম নজর থেকে।

বিজ্ঞাপন

তার তৈরি একটি ক্ষুদ্র দোকানের ভেতরে দেখা যায় সারি সারি বিস্কুট, চিপস, সাবান, পানীয়সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের প্যাকেট। পাশে রয়েছে বইভর্তি ছোট্ট লাইব্রেরি, টেবিল-চেয়ার, আলমারি ও বুকশেলফ। কোথাও লাল টেলিফোন বুথ, কোথাও ডাকবাক্স, ফুলের টব কিংবা পাখির বাসা। সব মিলিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে এক টুকরো গ্রামবাংলা।

একেকটি মিনি আর্ট তৈরি করতে কাওছারের কখনো কয়েক ঘণ্টা, আবার কখনো কয়েকদিন লেগে যায়। তবে তার এই সৃজনশীল কাজের শুরুটা হয়েছিল মাত্র ৩৫০ টাকা দিয়ে। নিজের ঘরের এক কোণে বসেই শুরু করেছিলেন কাজ। ছিল না বড় কোনো পুঁজি কিংবা আলাদা কর্মশালা। ছিল শুধু আগ্রহ, ধৈর্য আর নিজের হাতে কিছু একটা করার প্রবল ইচ্ছা।

‎শুরুতে কাজটি ছিল নিছক শখের। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের তৈরি শিল্পকর্মের ছবি প্রকাশ করলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসতে থাকে অর্ডার। বাড়তে থাকে পরিচিতি ও প্রশংসা। ধীরে ধীরে মিনি আর্টই হয়ে ওঠে তার আয়ের একটি উৎস।

কাওছারের হাতে তৈরি মিনি আর্ট। ছবি: সারাবাংলা

কাওছারের হাতে তৈরি মিনি আর্ট। ছবি: সারাবাংলা

‎বর্তমানে কাওছারের তৈরি মিনি আর্টের দাম ৩৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। মাসে গড়ে আয় করছেন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এই আয় দিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারেরও সহযোগিতা করছেন তিনি। নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে বাড়িতে ছোট পরিসরে গড়ে তুলেছেন গরুর খামারও।

‎কাওছারের কাজের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তিনি শুধু সাধারণ কোনো দোকান বা ঘরের ক্ষুদ্র সংস্করণ তৈরি করেন না। অনেকেই নিজেদের গ্রামের বাড়ি, পারিবারিক দোকান কিংবা শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত কোনো স্থাপনার আদলে মিনি আর্ট তৈরি করিয়ে নেন। ফলে কাওছারের হাতে তৈরি হচ্ছে শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়, মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি ও আবেগেরও ক্ষুদ্র প্রতিরূপ।

‎কাওছার সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘মানুষের নিজের গ্রামের বাড়ি, পারিবারিক দোকান কিংবা শৈশবের স্মৃতির কোনো স্থাপনা মিনি আর্টের মাধ্যমে তুলে ধরার সুযোগ আমাকে আনন্দ দেয়। মানুষের আবেগের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’

কাওছারের পরিবারও তার এই সৃজনশীলতায় খুশি। ছোটবেলা থেকেই হাতের কাজের প্রতি তার আগ্রহ ছিল বলে সারাবাংলাকে জানান তার বাবা নুরুল ইসলাম। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি সহপাঠীরাও তার কাজের প্রশংসা করেন। তাদের প্রত্যাশা, সুযোগ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে কাওছার ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারবেন।

‎স্থানীয়দেরও প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কাওছারের মতো আরও অনেক তরুণ ক্ষুদ্র শিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। ‎কারণ, সৃজনশীলতার জন্য সবসময় বড় পুঁজি প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি ছোট ঘরের এক কোণ, সামান্য কিছু উপকরণ আর স্বপ্নই হয়ে উঠতে পারে বড় সম্ভাবনার শুরু।

‎মাত্র ৩৫০ টাকা দিয়ে শুরু করা কাওছারের সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ হয়ে উঠেছে আত্মনির্ভরতার পথ। ক্ষুদ্র পরিসরে বাংলার গ্রামকে তুলে ধরে তিনি যেন প্রমাণ করছেন স্বপ্নের আকার বড় হতে হয় না, তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ইচ্ছাটাই সবচেয়ে বড়।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর