বাংলাদেশের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার ইতিহাসে যে নামটি প্রথমেই উচ্চারিত হয়, তিনি বিলকিস ইয়াসমিন সাথী—প্রথম ‘মিস বাংলাদেশ’। রূপ, ব্যক্তিত্ব আর আত্মবিশ্বাসের অনন্য মিশেলে এক সময় দর্শকের চোখে অনায়াসেই ধরা পড়েছিলেন তিনি। যদিও তার চলচ্চিত্রযাত্রা দীর্ঘ ছিল না, তবু অল্প সময়েই তিনি হয়ে উঠেছেন স্মরণীয়।
২৬ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া সাথী ১৯৯৫ সালে ‘মিস বাংলাদেশ’ হিসেবে অংশ নেন বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতা ‘মিস ওয়ার্ল্ড’-এ। সেই আন্তর্জাতিক মঞ্চেই তার জীবনে আসে একের পর এক বিরল অভিজ্ঞতা। তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে সাক্ষাৎ—যা নিঃসন্দেহে যে কারও জীবনের জন্য গর্বের মুহূর্ত। আরও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন বলিউডের কিংবদন্তি অমিতাভ বচ্চন। আন্তর্জাতিক পরিসরে এই উপস্থিতিই সাথীকে এনে দেয় আলাদা পরিচিতি ও আত্মবিশ্বাস।

চলচ্চিত্রে তার যাত্রা শুরু হয় প্রখ্যাত পরিচালক এহতেশামের হাত ধরে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কাজ করেন মান্না, ফেরদৌস, শাকিব খান ও রুবেলের মতো জনপ্রিয় নায়কদের সঙ্গে। ‘পরদেশী বাবু’, ‘অন্যায়ের প্রতিশোধ’, ‘বড় মালিক’, ‘আহা’, ‘বীর সৈনিক’—একাধিক ছবিতে তাঁর উপস্থিতি দর্শকের নজর কেড়েছিল। তবে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট আসে মান্নার বিপরীতে ‘আব্বাজান’ ছবির মাধ্যমে।
‘আব্বাজান’-এ মান্নার বিপরীতে অভিনয় করা ছিল সহজ নয়। কিন্তু সাথী সেই চ্যালেঞ্জে সফল হন। বিশেষ করে ছবির রোমান্টিক গান— ‘ঈশ্বর আল্লাহ্ বিধাতা জানে, তোমাকে কতখানি চাই’— এই গানটি তখন সারা দেশের মানুষের মুখে মুখে ফিরত। আবেগী কথা, মন ছুঁয়ে যাওয়া সুর আর সাথীর মায়াবী উপস্থিতি— সব মিলিয়ে তিনি এক লহমায় পৌঁছে যান ঘরে ঘরে।

‘যে মাটিতে বিধাতা গড়েছে আমায়, সে মাটিতে মিশে ছিলে তুমি’— এই একটি লাইনই আজও বহু দর্শকের হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে আছে। শুধু এই গানটির টানেই অনেকেই বারবার ‘আব্বাজান’ দেখতে বসতেন।
এরপর দেলোয়ার জাহান ঝন্টু পরিচালিত মান্নার বিপরীতে ‘বীর সৈনিক’ ছবিতে অভিনয় করে সাথী অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার— যা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। অন্যদিকে এনামুল করিম নির্ঝর পরিচালিত ফেরদৌসের বিপরীতে ‘আহা’ ছবিতেও তার অভিনয় প্রশংসিত হয়।

এই ছবির গান ‘লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প’, ফাহমিদা নবীর কণ্ঠে তিন দশক পেরিয়েও আজও সমান জনপ্রিয়। পর্দায় যাকে খুব বেশি ছবিতে দেখা যায়নি, এই একটি গানেই তিনি হয়ে আছেন চিরস্মরণীয়।
সময়ের স্রোতে ধীরে ধীরে সাথী সরে যান রূপালি পর্দার আলো থেকে। বর্তমানে তাকে আর সিনেমায় দেখা যায় না। জানা যায়, রাজধানীর একটি এলাকায় নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। তবে প্রয়াত নায়ক মান্নার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কৃতাঞ্জলির বিভিন্ন আয়োজনে মাঝেমধ্যে তার দেখা মেলে।

অল্প সময়ের ক্যারিয়ার হলেও বিলকিস ইয়াসমিন সাথী আজও স্মরণীয় …
প্রথম ‘মিস বাংলাদেশ’ হিসেবে,
মান্নার বিপরীতে ‘আব্বাজান’-এর সেই অমর গানটির নায়িকা হিসেবে,
এবং বাংলা সিনেমার এক নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে।