বিনোদন জগতের গ্ল্যামার আর আলোর নিচে কত যে চাপা অভিমান আর না বলা কথা থাকে, তা আমরা সাধারণ দর্শকেরা খুব কমই আঁচ করতে পারি। নব্বইয়ের দশকের সেই সোনালী দিনগুলোর কথা ভাবুন, যখন রুপালি পর্দায় শাহরুখ খানের ঠোঁট মেলানো মানেই ছিল নেপথ্যে অভিজিৎ ভট্টাচার্যের সেই মায়াবী কণ্ঠ। ‘বড়ি মুশকিল হ্যায়’, ‘তওবা তুমহারে ইয়ে ইশারে’ কিংবা ‘বাদশাহ ও বাদশাহ’ এই গানগুলো ছাড়া কি কিং খানের রোমান্টিক ইমেজ আজ এই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারত? উত্তরটা আমাদের সবারই জানা। কিন্তু আজ সেই চেনা যুগলবন্দি কেবলই ইতিহাস। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যে বিবাদ চলছে, তা নিয়ে এবার বিস্ফোরক সব তথ্য সামনে আনলেন খোদ অভিজিৎ। তার জবানিতে উঠে এল বলিউড বাদশাহর প্রতি একরাশ ক্ষোভ, উপেক্ষা আর এক বুক অভিমান।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ ভট্টাচার্য অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই বিবাদের মূলে রয়েছে শাহরুখ খানের আকাশচুম্বী অহংকার এবং তার নিজের অটুট আত্মসম্মান। ক্যারিয়ারের একটা লম্বা সময় অভিজিৎ নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন শাহরুখের জন্য। তিনি এতটাই একনিষ্ঠ ছিলেন যে, একটা সময় অন্য সব নায়কের জন্য গান গাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনি গর্ব করে বলতেন, ‘আমি শাহরুখের কণ্ঠস্বর এবং অন্য কারো জন্য কখনও গাইব না’। এটা কোনো দম্ভ ছিল না, বরং ছিল একজন শিল্পীর তার প্রিয় সহকর্মীর প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর বিশ্বাস। কিন্তু বিনিময়ে তিনি যা পেয়েছেন, তা কেবলই অবহেলা।
অভিজিতের মনে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে শাহরুখের দ্বিমুখী আচরণ দেখে। গায়ক অত্যন্ত দুঃখের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, শাহরুখের থেকে বয়সে ছোট হওয়া সত্ত্বেও তিনি কিং খানের থেকে ন্যূনতম সৌজন্য আশা করেছিলেন। তিনি দেখেছেন, ফারহা খানের স্বামী যখন শাহরুখকে কটু কথা বলেছিলেন, তখনও শাহরুখ তাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। এমনকি আমির খান যখন তার পোষা কুকুরের নাম ‘শাহরুখ’ রেখেছিলেন, তখনও সেই বন্ধুত্বে ফাটল ধরেনি। অথচ যে মানুষটি বছরের পর বছর নিজের কণ্ঠ দিয়ে শাহরুখকে পর্দার ম্যাজিক বানিয়েছেন, সেই অভিজিতের সাথে সামান্য একটি ভুল বোঝাবুঝি মেটাতে শাহরুখ একবারের জন্যও এগিয়ে আসেননি।
বিবাদের সূত্রপাত হয়েছিল ২০০৪ সালে, যখন শাহরুখের নিজস্ব প্রোডাকশনের ছবি ‘ম্যায় হুঁ না’ মুক্তি পায়। ছবিটিতে অভিজিতের গাওয়া গানগুলো সুপারহিট হলেও, সেখানে তাকে যথাযথ স্বীকৃতি বা ক্রেডিট দেওয়া হয়নি বলে তার অভিযোগ। ছবির শেষে যখন সেটের সবাইকে নিয়ে প্রশংসা করা হচ্ছিল, তখন গায়কদের একরকম উপেক্ষা করা হয়েছিল। এই অবহেলাই মেনে নিতে পারেননি অভিমানী এই শিল্পী। তার মতে, শাহরুখের মতো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব যদি একবার এসে শুধু বলতেন, ‘চলো অভিজিৎ, যা হয়েছে ভুলে যাও’, তবে হয়তো আজ চিত্রটা অন্যরকম হতো। একটি মাত্র আলিঙ্গন বা একটা ছোট্ট ‘সরি’ তেই গলে যেতে পারত হিমালয়সম পাহাড়ের মতো বরফ। কিন্তু বাদশা ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি।
অভিজিৎ বিশ্বাস করেন, মানুষের স্মৃতি বড়ই স্বল্পস্থায়ী। আজ হয়তো মানুষ রাজেশ খান্নার মতো বড় তারকাকে মনে রেখেছে, কিন্তু তার কালজয়ী গানগুলো যে কিশোর কুমার বা রফি সাহেবের কণ্ঠের জাদুতে অমর হয়েছে, তা নতুন প্রজন্ম ভুলতে বসেছে। একইভাবে শাহরুখের আজকের এই সাফল্যের পেছনে নেপথ্যের কারিগরদের যে অবদান আছে, তা একদিন ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে। তবে অভিজিতের কণ্ঠে আজ আর সেই হাহাকার নেই, আছে এক কঠিন বাস্তবতা। তিনি মনে করেন, তিনি যে অবহেলার শিকার হয়েছেন, একদিন হয়তো শাহরুখকেও নিজের হোম প্রোডাকশনে ঠিক একই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হবে। দম্ভ আর আত্মসম্মানের এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি হলো কার? হয়তো সেই হাজার হাজার ভক্তের, যারা আজও মনে মনে চান, আবার একবার কিং খানের লিপে বেজে উঠুক অভিজিতের সেই চিরচেনা সুর। কিন্তু অভিমানের দেয়ালটা যে এখন বড্ড বেশি উঁচু হয়ে গেছে!