Monday 04 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

পিকআপ যেন ‘মৃত্যুফাঁদ’, সিলেটে ২ বারে ঝরল ২৪ প্রাণ

জুলফিকার তাজুল ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৪ মে ২০২৬ ২৩:২০

পিকআপ যেন ‘মৃত্যুফাঁদ’, সিলেটে ২ বারে ঝরল ২৪ প্রাণ। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

সিলেট: চলছে মহান মে মাস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে কয়েকদিন আগেই পালিত হলো ‘পহেলা মে’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’। বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায় আর নিরাপদ কর্মপরিবেশের স্বীকৃতির মাস এটি। তবে ‘পহেলা মে’র আবহ না কাটতেই সিলেটের রাজপথ রঞ্জিত হলো নয় নির্মাণ শ্রমিকের তাজা রক্তে। রোববার (৩ মে) ভোরের আলো ফোটার আগেই দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজারে যে মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা হলো, তা যেন আধুনিক সভ্যতায় শ্রমিকের জীবনের চরম অবমূল্যায়নের এক বীভৎস দলিল।

রক্তাক্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

তেলিবাজারের এই ‘মরণফাঁদ’ কি শুধুই নিছক এক ‘দুর্ঘটনা’? ঠিক তিন বছর আগে একই কায়দায় নাজির বাজারে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৫ নির্মাণ শ্রমিক। সময়ের ব্যবধানে লাশের মিছিলের স্থান বদলেছে, সংখ্যা বদলেছে; কিন্তু বদলায়নি মৃত্যুর নির্মম ধরণ আর শ্রমিকদের অরক্ষিত জীবনের চিত্র। গত তিন বছরে এভাবেই ডিআই পিকআপে করে অনিরাপদ যাতায়াতের বলি হতে হয়েছে ২৪ জন নিরীহ শ্রমিককে।

বিজ্ঞাপন

মেশিন বনাম মানুষের জীবন

দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বিশ্লেষণ করলে গা শিউরে ওঠে। একটি সরু ডিআই পিকআপ ভ্যানে গাদাগাদি করে শ্রমিকদের পাশাপাশি তোলা হয়েছিল ভারী ওজনের কংক্রিট মিক্সচার মেশিন। মরণঘাতী ট্রাকের ধাক্কায় যখন শ্রমিকরা পাখির ছানার মতো রাস্তায় ছিটকে পড়ছিল, তখন সেই ভারী মিক্সচার মেশিনের আঘাতেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় তাদের হাড়গোড়। জীবন বাঁচানোর তাগিদে কাজের সন্ধানে বের হওয়া মানুষগুলো অজান্তেই যেন পা বাড়িয়েছিলেন যমদূতের বাহনে।

লাশ ঘর, ময়নাতদন্তের পর এখানেই মরদেহগুলো রাখা হয়। ছবি: সারাবাংলা

লাশ ঘর, ময়নাতদন্তের পর এখানেই মরদেহগুলো রাখা হয়। ছবি: সারাবাংলা

অদক্ষ হাত ও প্রশাসনের উদাসীনতা

ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের তথ্যে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ সত্য। পণ্যবাহী ট্রাকটির স্টিয়ারিংয়ে ছিল অদক্ষ হেলপার, আর মূল চালক ছিলেন দীর্ঘ সময় নির্ঘুম থেকে ক্লান্ত। চালকের এই বেপরোয়া মানসিকতা সরাসরি অপরাধের শামিল হলেও মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের নজরদারির অভাব যেন চিরস্থায়ী অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নজরদারির এই ফাঁক গলে প্রতিনিয়ত ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর অদক্ষ চালকরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজপথ।

সাশ্রয়ের বলি হচ্ছে স্বপ্ন

নির্মাণ শ্রমিক হামিদ মিয়ার আক্ষেপ, ‘ট্রাকে ওঠার পর নিজেকে আর মানুষ মনে হয় না, বস্তার মতো মনে হয়।’ ঠিকাদাররা সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মেশিনের পাশে তুলে দেন।

আইন বনাম বাস্তবতা

যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ডিআই পিকআপে যাত্রী পরিবহণ অবৈধ এবং তাদের অভিযান চলমান রয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কাকডাকা ভোরে আম্বরখানা এলাকায় গেলেই দেখা যায়, শত শত শ্রমিককে এভাবেই মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পিকআপে উঠতে হচ্ছে। এসএমপি ট্রাফিক বিভাগের মতে, সচেতনতার অভাবই দুর্ঘটনার বড় কারণ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—ঠিকাদারদের এই খামখেয়ালি আর প্রশাসনের শিথিলতার দায়ভার কে নেবে?

প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, শোকের ছায়া নেমে আসে। কিন্তু, সেই নয়টি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ঘুচে না। প্রতিদিন নয়, বরং ‘মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে’—ঠিকাদারদের এমন নির্লিপ্ত বয়ানই বলে দেয়, শ্রমিকের প্রাণের মূল্য আজ কতটা সস্তা। সিলেটের রাজপথে এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে এখন প্রয়োজন শুধু আইন নয়, বরং আইনের কঠোর ও নিয়মিত প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট মহলের মানবিক দায়বদ্ধতা।

নিসচার বক্তব্য

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন (নিসচা) সিলেট জেলার আহবায়ক জহিরুল ইসলাম মিশু সারাবাংলাকে বলেন, ‘ডিআই ট্রাক হলো মালামাল পরিবহণের জন্য। কিন্তু, আমরা প্রায়ই দেখি ডিআই পিকআপের মাধ্যমে পণ্যের সঙ্গে অতিরিক্ত মানুষ বোঝাই করে সিলেটের মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করেল। যা সম্পূর্ণ রূপে অবৈধ।’

তেলিবাজারে দুর্ঘটনায় নিহতদের মরদেহ নিতে অপেক্ষায় স্বজনরা। ছবি: সারাবাংলা

তেলিবাজারে দুর্ঘটনায় নিহতদের মরদেহ নিতে অপেক্ষায় স্বজনরা। ছবি: সারাবাংলা

সচেতন মহল যা বলছে

দীর্ঘদিন ধরে হাই-রাইজ বিল্ডিংয়ের ডিজাইন তৈরি করেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মো. জসিম উদ্দিন। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘একটি ডিআই ট্রাকে বড় মিক্সচার মেশিন তোলার পর মাত্র তিন/চার জনের জায়গা থাকে। অথচ, সেখানে তোলা হয় ২০ থেকে ২৭ জন। এতে গাড়ির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, যা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভোরে এসব শ্রমিককে নিয়ে যাওয়া হয়। যে কারণে ডিআই ট্রাকের চালকের চোখেও যেমন ঘুম থাকে, তেমনি সড়কে যেসব যানবাহন চলে, সেগুলোর ক্লান্ত চালকের চোখও ঘুমের ঘোরে থাকে। যার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে।’

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ যদি এই গাড়িগুলোর বিপক্ষে আইনের সঠিক প্রয়োগ করতো—তাহলে আজ এতগুলো তরতাজা প্রাণহানি ঘটতো না।’ এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি জনসচেতনতার বিকল্প নেই বলেও জানান তিনি।

প্রশাসনের বক্তব্য

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) উপ-কমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় সারাবাংলাকে বলেন, ‘সড়ক পরিবহণ আইনে ডিআই পিকআপে নির্মাণ শ্রমিক বহন করা অবৈধ, আমরা বিভিন্ন সময় এসব পিকআপ আটক ও জরিমানা করেছি। এখনো এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। মহানগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে নিয়মিত চেকপোস্টে বেপরোয়া ডিআই পিকআপ, ট্রাক সিএনজি ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।’

পণ্যবাহী ডিআই পিকআপে শ্রমিক বোঝাইয়ের কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটে জানিয়ে ট্রাফিক ডিসি আরও বলেন, ‘পণ্যবাহী বাহনে তো মানুষ চলাচল নিষিদ্ধ। এটা সবাই জানে, তারপরও সুযোগ পেলে অনেক সচেতন মানুষও উঠে পড়েন। একটা দুর্ঘটনা ঘটলে সবার টনক নড়ে। পরে আর খোঁজ থাকে না। ফলে এটাই চলছে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি মানুষকে আরও বেশি করে সচেতনতা বাড়াতে হবে।’

এ বিষয়ে একাধিক বিল্ডিংয়ে কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তারা কথা বলতে রাজি হননি। তবে এক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটা তো নতুন কিছু নয়। সবসময় এভাবেই আমরা ছাদ ঢালাইয়ের কাজে শ্রমিক নিয়ে যাই। মাঝে-মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে। প্রতিদিন ঘটলে না হয় আমাদের দোষ।’

উল্লেখ্য, এর আগে, ২০২৩ সালের ৭ জুন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে দক্ষিণ সুরমার নাজির বাজারে শ্রমিক বহনকারী ডিআই পিকআপের সঙ্গে ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে দুর্ঘটনাস্থলেই নয় নির্মাণ শ্রমিক এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও ছয় জনসহ মোট ১৫ জন প্রাণ হারান। আহত হন ১০ জন। তারাও নগরের আম্বরখানা থেকে গোয়ালাবাজার যাচ্ছিলেন একটি বিল্ডিংয়ের ঢালাইকাজে অংশ নিতে।

সারাবাংলা/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

জুলফিকার তাজুল - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর