একসময় মানুষ বিশ্বাস করত— পৃথিবী স্থির, আকাশই ঘুরছে। সূর্য ওঠে, চাঁদ ডোবে, নক্ষত্রেরা রাতভর স্থান বদলায়—সবই যেন পৃথিবীর চারদিকে আবর্তনের ফল। কিন্তু এই প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে এক নিঃশব্দ অথচ দৃঢ় প্রমাণ দাঁড় করিয়েছিলেন এক ফরাসি বিজ্ঞানী— লিওঁ ফুকো (Léon Foucault)।
১৮৫১ সালের ৮ জানুয়ারি, তার একটি সাধারণ অথচ যুগান্তকারী পরীক্ষা পৃথিবীর ঘূর্ণনকে চোখের সামনে এনে দেয়।
একজন পরীক্ষানির্ভর বিজ্ঞানী
লিওঁ ফুকোর জন্ম ১৮১৯ সালে, ফ্রান্সে। তিনি ছিলেন মূলত একজন পরীক্ষামূলক পদার্থবিদ—যাঁর আগ্রহ ছিল তত্ত্বের চেয়ে বাস্তব প্রমাণে। আলো의 গতি পরিমাপ থেকে শুরু করে জ্যোতির্বিজ্ঞানের নানা প্রশ্নে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ফুকোর দোলক (Foucault Pendulum)–এর জন্য।
ফুকোর দোলক: সহজ কিন্তু বিপ্লবী
ফুকোর পরীক্ষাটি ছিল অবিশ্বাস্য রকম সরল। প্যারিসের প্যানথিয়ন ভবনের ছাদ থেকে তিনি একটি লম্বা তার ঝুলিয়ে তার নিচে ভারী একটি দোলক (পেন্ডুলাম) বসান। দোলকটিকে দোলাতে শুরু করার পর তিনি লক্ষ্য করেন—সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দোলকের দোলার দিক ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, দোলক নিজে দিক বদলায়নি। দিক বদলেছে আসলে পৃথিবী।
পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর ঘুরতে থাকায়, নিচের মেঝে ধীরে ধীরে ঘুরে যাচ্ছে— আর সেই তুলনায় দোলকের দোলন সমতল স্থির থাকছে। ফলে পর্যবেক্ষকের চোখে মনে হয় দোলকের দিক পরিবর্তন হচ্ছে।
চোখে দেখা প্রমাণ
এর আগে পৃথিবীর ঘূর্ণন নিয়ে বৈজ্ঞানিক ধারণা ও গণিতীয় ব্যাখ্যা থাকলেও, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বোঝা সহজ ছিল না। ফুকোর দোলক ছিল প্রথম এমন পরীক্ষা— যা খালি চোখে পৃথিবীর ঘূর্ণন দেখার সুযোগ দেয়।
এই পরীক্ষার পর আর পৃথিবীর ঘূর্ণন নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকেনি। বিজ্ঞান কক্ষের জটিল সমীকরণ পেরিয়ে বিষয়টি পৌঁছে যায় জনসমক্ষে।
বিজ্ঞানের গণতন্ত্রীকরণ
ফুকোর সবচেয়ে বড় অবদান শুধু একটি আবিষ্কার নয়—
তিনি বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান ও বোধগম্য করে তুলেছিলেন।
আজও বিশ্বের বহু জাদুঘর, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিজ্ঞানকেন্দ্রে ফুকোর দোলক ঝুলছে। এটি শুধু একটি যন্ত্র নয়—এটি মানব জ্ঞানের অগ্রযাত্রার প্রতীক।
পৃথিবীর ঘূর্ণন দিবস
এই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে ৮ জানুয়ারি পালিত হয় পৃথিবীর ঘূর্ণন দিবস (Earth’s Rotation Day)। দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
পৃথিবী যেমন নীরবে ঘুরছে, তেমনি বিজ্ঞানও এগিয়ে চলে প্রশ্ন, পরীক্ষা আর প্রমাণের পথে।
নীরব দোলকের শিক্ষা
ফুকোর দোলক আমাদের শেখায়— সত্য সবসময় গর্জন করে আসে না। কখনও কখনও একটি নীরব দোলনই বদলে দেয় মানুষের চিরচেনা বিশ্বাস।
পৃথিবী ঘোরে— এ কথা আজ আমরা জানি। কিন্তু সেই জানার পেছনে লুকিয়ে আছে এক দোলকের নীরব, অবিচল দোলন।