Sunday 11 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মহিয়সী নারী সৈয়দা হোসনে আরা বেগম: বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক দীপ্ত নাম

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:৫৯ | আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:২০

বাংলার ইতিহাসে কিছু নারী আছেন, যারা রাজসিংহাসনে বসেননি, তবু তাদের জীবন ও আদর্শ হয়ে ওঠে একটি জাতির নীরব অনুপ্রেরণা। তেমনই এক মহিয়সী নারীর নাম সৈয়দা হোসনে আরা বেগম। ঐতিহ্যবাহী নবাব পরিবারে জন্ম ও উত্তরাধিকার পেলেও তিনি পরিচিত ছিলেন নিজের চরিত্র, ধর্মনিষ্ঠা, মানবিকতা ও ত্যাগের জন্য।

১০ জানুয়ারি— এই দিনটি এলেই বাংলার ইতিহাসপ্রেমী ও নবাব পরিবারের অনুরাগীদের মনে ফিরে আসে এক গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগ। কারণ, এ দিনেই ইহজগৎ ত্যাগ করেন বাংলার এই গুণী নারী।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

১৯ মার্চ জন্ম নেওয়া সৈয়দা হোসনে আরা বেগম ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক সৈয়দ নাসির আলী মির্জা ও মহিয়সী নারী গুলশান আরা বেগমের স্নেহধন্য কন্যা। তাঁর জীবনসঙ্গী প্রকৌশলী এস. জি. মোস্তাফা— যিনি ছিলেন বাংলার বীর নবাব সিরাজউদ্দৌলার অষ্টম বংশধর।

বিজ্ঞাপন

এই সূত্রেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরিবারের গৃহবধূ। চার সন্তানের জননী সৈয়দা হোসনে আরা বেগম পরিবারকে আগলে রেখে ঐতিহ্য রক্ষা ও মূল্যবোধের চর্চাকে জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন।

ধর্মনিষ্ঠা ও মানবিক জীবনবোধ

সৈয়দা হোসনে আরা বেগম ছিলেন গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ। প্রতিদিন ফজরের নামাজ ও কোরআন তেলাওয়াতে তিনি খুঁজে পেতেন আত্মিক প্রশান্তি। সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর দরবারে দেশ ও দেশবাসীর মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করাই ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। প্রায় সারা বছর রোজা পালন, দান-খয়রাত এবং গরিব-দুঃখীদের সেবাই ছিল তার জীবনের অলিখিত নিয়ম।

তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন— সত্যবাদিতা ও ন্যায়পরায়ণতাই মানুষের প্রকৃত কল্যাণের পথ।

ঐতিহ্য ও সেবার এক অনন্য সমন্বয়

নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরিবারের নবাবী ঐতিহ্য সংরক্ষণে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন ও নিষ্ঠাবান। ইতিহাসের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি বিদেশের মাটিতে নবাব আলিবর্দী খান ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার পুণ্যভূমি মদিনা ও খোসবাগ জিয়ারত করেন।

তিনি ছিলেন একাধারে স্নেহশীলা গৃহিণী ও সেরা রাঁধুনি। সুযোগ পেলেই নিজের হাতে রান্না করা খাবার গরিব মানুষদের খাওয়াতেন। পশু-পাখি, ফল ও ফুলের বাগানের সঙ্গে ছিল তার গভীর সখ্য— যার মধ্য দিয়ে তিনি অনুভব করতেন সৃষ্টিকর্তার মহিমা।

সন্তানদের মাঝে তার আদর্শ

তার সন্তানদের মধ্যে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরিবারের নবম প্রজন্মের উত্তরাধিকারী সৈয়দ গোলাম আব্বাস আরেব ওরফে নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা সততা, ন্যায়, দেশপ্রেম ও সাহসিকতার জন্য সুপরিচিত। তাঁর এই চারিত্রিক দৃঢ়তার পেছনে ছিল মায়ের শিক্ষা ও আদর্শের শক্ত ভিত।

এক আদর্শ নারীর প্রস্থান

২০০১ সালের ১০ জানুয়ারি— নীরবে থেমে যায় এক মহৎ জীবনের পথচলা। অশ্রুসজল প্রার্থনার মাঝেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আজও তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে স্বজন ও গুণীজনেরা পরম করুণাময়ের কাছে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

চিরস্মরণীয় এক নাম

সৈয়দা হোসনে আরা বেগম ছিলেন সহৃদয়তা, দয়া, সততা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের উজ্জ্বল প্রতীক। নতুন প্রজন্ম তাকে শ্রদ্ধাভরে ডাকত ‘বেগম আম্মা’ নামে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত তার দোয়া ও সান্নিধ্যের আশায়।

বাংলার ইতিহাসে তিনি রয়ে গেছেন এক নীরব আলোকবর্তিকা হয়ে— যার জীবন আমাদের শেখায় ত্যাগ, মানবিকতা ও বিশ্বাসের প্রকৃত মানে।

বঙ্গীয় এই মহিয়সী মুসলিম নারী সৈয়দা হোসনে আরা বেগমের প্রতি লাল-সবুজের বাংলার পক্ষ থেকে রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর