লেবাননের প্রাচীন নগর বা’আলবেক (Baalbek)— একসময়কার হেলিওপোলিস—আজও মানবসভ্যতার এক অনন্য বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানেই অবস্থিত রোমান সভ্যতার সবচেয়ে বৃহৎ ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর একটি, জুপিটার মন্দির। কিন্তু এই মন্দিরের সৌন্দর্য কিংবা স্থাপত্য নয়— সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে এর দৈত্যাকার পাথরগুলো। কীভাবে, কারা, কোন প্রযুক্তিতে এসব পাথর কাটা ও স্থাপন করা হয়েছিল— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আজও চলছে গবেষণা।
পাথরের রাজত্ব: ট্রিলিথনের বিস্ময়
জুপিটার মন্দিরের ভিত্তিতে ব্যবহৃত তিনটি বিশাল পাথরকে বলা হয় ট্রিলিথন (Trilithon)। প্রতিটি পাথরের ওজন আনুমানিক ৮০০ থেকে ১,০০০ টন— যা আধুনিক অনেক ক্রেনের ধারণক্ষমতারও বাইরে।
আরও বিস্ময়কর হলো, কাছেই অবস্থিত খনিতে পাওয়া গেছে আরও বড় পাথর—
‘Stone of the Pregnant Woman’ (হাজার টনের বেশি),
‘Stone of the South’ (প্রায় ১,৬৫০ টন),
সাম্প্রতিক গবেষণায় চিহ্নিত একটি পাথরের ওজন ধরা হয় ১,৭০০ টনেরও বেশি
এগুলো ইতিহাসে ব্যবহৃত সবচেয়ে ভারী কাটা পাথরের মধ্যে অন্যতম।
কারা কাটলো এই বিরাট পাথর?
প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতক থেকে খ্রিস্টীয় ২য় শতকের মধ্যে রোমানরা এই মন্দির নির্মাণ শুরু করে। রোমান প্রকৌশল ছিল অত্যন্ত উন্নত—তারা আর্চ, কংক্রিট, রাস্তা ও জলবাহী ব্যবস্থায় পারদর্শী ছিল।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—
কীভাবে তারা এত ভারী পাথর কাটা, সরানো ও নিখুঁতভাবে বসানো সম্ভব করল?
কেন এত বিশাল পাথর ব্যবহার করা হলো, যেখানে ছোট ব্লকেও কাজ চলত?
কিছু গবেষকের মতে, রোমানদের আগেই ফিনিশীয় বা আরও প্রাচীন কোনো সভ্যতা এই ভিত্তি তৈরি করেছিল, রোমানরা পরে তার ওপর মন্দির গড়ে তোলে।
প্রযুক্তি না হারানো জ্ঞান?
আধুনিক প্রকৌশলীরা ধারণা দেন—
রোলার, লিভার ও ঢালু র্যাম্প ব্যবহার করে পাথর সরানো হতে পারে। মানবশক্তির সঙ্গে পশুশক্তির সম্মিলিত প্রয়োগ ছিল সম্ভাব্য উপায়। তবু সমস্যা হলো— এত ওজনের পাথর উঁচু প্ল্যাটফর্মে তোলা ও মিলিমিটার-নিখুঁতভাবে বসানো আজও কঠিন কাজ।
এই কারণেই কেউ কেউ বলেন, এটি হয়তো হারিয়ে যাওয়া কোনো উন্নত প্রযুক্তি কিংবা প্রাচীন জ্যামিতি ও ভারসাম্যবিদ্যার অসাধারণ প্রয়োগ।
কল্পনা, বিতর্ক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি
বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার বাইরে গিয়ে কিছু মানুষ এখানে খোঁজেন—
ভিনগ্রহের সভ্যতা,
অতিমানবীয় শক্তি,
বা প্রাগৈতিহাসিক উন্নত প্রযুক্তির চিহ্ন।
তবে মূলধারার প্রত্নতত্ত্ববিদরা এসব ব্যাখ্যাকে প্রমাণহীন কল্পনা হিসেবেই দেখেন। তাঁদের মতে, এটি মানবসভ্যতারই এক চরম প্রকৌশল কীর্তি— যার সব রহস্য হয়তো এখনও আমরা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।
এক প্রশ্নচিহ্ন হয়ে থাকা ইতিহাস
জুপিটার মন্দির আজ ধ্বংসাবশেষ, কিন্তু তার পাথরগুলো অটল— সময়, ভূমিকম্প ও যুদ্ধের মধ্যেও দাঁড়িয়ে আছে। এই পাথরগুলো যেন আমাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—
আমরা কি প্রাচীন মানুষদের সক্ষমতাকে ছোট করে দেখছি?
নাকি ইতিহাসের কোনো অধ্যায় এখনও অজানা রয়ে গেছে?
শেষ কথা
বা’আলবেকের জুপিটার মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়— এটি মানব ইতিহাসের এক অমীমাংসিত অধ্যায়। দৈত্যাকার পাথরের এই নীরব কাঠামো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার অগ্রযাত্রা সব সময় সরলরেখায় এগোয় না। কিছু জ্ঞান হারিয়ে যায়, কিছু রহস্য থেকে যায়— আর কিছু স্থাপনা চিরকাল প্রশ্ন করে যেতে থাকে।
এই প্রশ্নই জুপিটার মন্দিরের সবচেয়ে বড় উত্তর।