Tuesday 13 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

অ্যাঞ্জেলিক ডু কৌড্রে: অন্ধকার যুগে প্রসব বেদনার আলোকবর্তিকা

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:৩৯

আঠারো শতকের ফ্রান্স। সে সময় সন্তান জন্মদান ছিল একজন নারীর জীবনের অন্যতম ভীতিকর অভিজ্ঞতা। একদিকে প্রসবকালীন জটিলতা, অন্যদিকে যথাযথ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অভাব— সব মিলিয়ে প্রসূতি কক্ষগুলো প্রায়ই শোকের ঘরে পরিণত হতো। সেই অন্ধকার সময়ে এক নারী আশার প্রদীপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যার নাম অ্যাঞ্জেলিক মার্গারিট লে বোর্সিয়ার ডু কৌড্রে। তিনি কেবল একজন ধাত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন হাজারো মা ও শিশুর জীবন রক্ষাকারী এক নিভৃতচারী কারিগর।

জীবনের ঝুঁকি বনাম জ্ঞানের অভাব

১৭১২ সালে জন্ম নেওয়া ডু কৌড্রে এমন এক সময়ে তার পেশাজীবন শুরু করেন যখন ধাত্রীবিদ্যা ছিল কেবল পারিবারিক অভিজ্ঞতানির্ভর একটি কাজ। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই গ্রামগঞ্জের ধাত্রীরা সন্তান প্রসব করাতেন, যা অনেক সময় মারাত্মক ভুলের কারণ হয়ে দাঁড়াত। ফলে মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যু ছিল এক ভয়াবহ নিয়মিত ঘটনা। ডু কৌড্রে উপলব্ধি করেছিলেন, ভয়কে জয় করতে হলে প্রয়োজন সঠিক প্রশিক্ষণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক চর্চা।

বিজ্ঞাপন

রাজকীয় সমর্থন ও দেশব্যাপী মিশন

১৭৫৯ সালে ফ্রান্সের রাজা লুই পঞ্চদশ ডু কৌড্রের অসাধারণ দক্ষতা দেখে তাকে এক বিশেষ দায়িত্ব দেন। রাজকীয় নির্দেশে তিনি পুরো ফ্রান্স ভ্রমণে বের হন। উদ্দেশ্য ছিল—প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ নারী ও সার্জনদের আধুনিক ধাত্রীবিদ্যা শেখানো। পরবর্তী ৩০ বছর তিনি বিরামহীনভাবে এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং প্রায় ১০ হাজার নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম সফল জনস্বাস্থ্য প্রকল্প।

কালজয়ী উদ্ভাবন: ‘দ্য মেশিন’

ডু কৌড্রের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল তার উদ্ভাবনী শক্তি। তিনি জানতেন, শুধু মুখে বলে প্রসবের জটিল প্রক্রিয়া বোঝানো সম্ভব নয়। তাই তিনি কাপড়, চামড়া এবং হাড় দিয়ে মানুষের শরীরের আদলে বিশ্বের প্রথম ‘প্রসব-পুতুল’ বা সিমুলেটর তৈরি করেন।

এই পুতুলটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘দ্য মেশিন’।

এর মাধ্যমে ধাত্রীরা কোনো জীবনের ঝুঁকি ছাড়াই হাতে-কলমে শিখতে পারতেন কীভাবে গর্ভস্থ শিশুর অবস্থান বুঝতে হয় এবং জটিল পরিস্থিতিতে কীভাবে নিরাপদে শিশু বের করে আনতে হয়।

১৭৭৩ সালে তার প্রকাশিত পাঠ্যপুস্তক Abrégé de l’art des accouchements ধাত্রীবিদ্যাকে একটি এলোমেলো শিল্প থেকে একটি সুশৃঙ্খল বিজ্ঞানে রূপ দেয়।

একটি নীরব বিপ্লব

ডু কৌড্রের এই নিরলস প্রচেষ্টায় ফ্রান্সে মাতৃমৃত্যুর হার অবিশ্বাস্যভাবে কমে আসে। তিনি সমাজের অবহেলিত ধাত্রীদের পেশাগত মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ১৭৯৪ সালে যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন ফ্রান্সের ধাত্রীবিদ্যার চিত্রটি পুরোপুরি বদলে গেছে। ভয়ের জায়গা দখল করেছে বিজ্ঞান আর আত্মবিশ্বাস।

আজকের আধুনিক প্রসূতিবিদ্যায় আমরা যে সিমুলেশন বা হাতে-কলমে শিক্ষার গুরুত্ব দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এই মহীয়সী নারী। ইতিহাসে তার নাম হয়তো অনেক বড় বীরদের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে, কিন্তু প্রতিটি নিরাপদ জন্মদানের হাসিতে আজও অ্যাঞ্জেলিক ডু কৌড্রের স্বপ্ন বেঁচে আছে।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর