Monday 22 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

অনেক আয়ের পরও যে কারণে সংসারে অভাব দূর হয় না!

সারাবাংলা ডেস্ক
২২ জুন ২০২৬ ১৬:৪৭

অনেকেরই মাস শেষে মোটা অঙ্কের টাকা রোজগার হয়, কিন্তু তবুও সংসারে টানাটানি মেটে না, শান্তিতে দিন কাটে না কিংবা জমানো কোনো টাকা থাকে না। ইসলাম মনে করে, প্রাচুর্যের আসল রহস্য অঢেল সম্পদের মাঝে নয়, বরং তার ভেতরের ‘বরকত’ বা ঐশী কল্যাণের মাঝে লুকিয়ে আছে।

ইসলামের পরিভাষায় ‘বরকত’ হলো কোনো সীমিত জিনিসেও আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক অদৃশ্য কল্যাণ ও স্থায়িত্ব যুক্ত হওয়া, যা মানুষের সব প্রয়োজন সুন্দরভাবে মিটিয়ে দেয়। অপরদিকে, বরকতহীন বিপুল অর্থসম্পদও মানুষের জীবনে কোনো শান্তি আনতে পারে না।

আসুন জেনে নেই, কুরআন ও হাদিসের আলোতে এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত অভ্যাস, যা মানুষের জীবন থেকে উপার্জনের বরকত কেড়ে নেয়…

বিজ্ঞাপন

অকৃতজ্ঞতার মনোভাব

আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত ভোগ করার পর তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে জীবনের কল্যাণ ও বরকত হ্রাস পায়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন…

‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে মনে রেখো, আমার শাস্তি কিন্তু অত্যন্ত ভয়াবহ।’ (সূরা ইবরাহিম: ৭)

অবাধ্যতা ও পাপাচারে লিপ্ত থাকা

সারাক্ষণ গুনাহ ও অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকলে মানুষের জীবন থেকে মানসিক শান্তি ও উপার্জনের বরকত চলে যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন…

‘আর যদি সেই সব জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অবলম্বন করত, তবে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতের দরজাসমূহ খুলে দিতাম।’ (সূরা আরাফ: ৯৬)

উপার্জনে হারামের মিশ্রণ

অন্যায়, অবৈধ বা হারাম পন্থায় উপার্জিত অর্থে কখনো কল্যাণ আসতে পারে না। এমন অর্থ আল্লাহর দরবারেও কবুল হয় না। আল্লাহর রাসুল (স.) বলেছেন…

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পবিত্র, আর তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)

লেনদেনে অসততা ও ধোঁকাবাজি

ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা যেকোনো আর্থিক লেনদেনে ক্রেতা বা বিক্রেতাকে ঠকানো বরকত চলে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিসে এসেছে…

‘ক্রেতা-বিক্রেতা যতক্ষণ একে অপরের থেকে আলাদা না হয়, ততক্ষণ তাদের চুক্তি বহাল বা বাতিল করার অধিকার থাকে। যদি তারা সত্য কথা বলে এবং মালের আসল অবস্থা (ত্রুটিসহ) স্পষ্ট করে, তবে তাদের কেনাবেচায় বরকত দেওয়া হয়। কিন্তু যদি তারা মিথ্যা বলে এবং কোনো খুঁত লুকিয়ে রাখে, তবে সেই ব্যবসার বরকত চিরতরে মিটিয়ে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি: ২০৭৯)

কথায় কথায় কসম খাওয়া

পণ্য বিক্রি করার জন্য বা নিজের কথা বিশ্বাস করানোর জন্য ঘন ঘন আল্লাহর নামে শপথ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ। রাসুলুল্লাহ (স.) সতর্ক করে বলেছেন…

‘মিথ্যা কসম হয়তো সাময়িকভাবে পণ্য বিক্রি বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু তা উপার্জনের বরকত ধ্বংস করে দেয়।’ (সহিহ বুখারি: ২০৮৭)

সুদের সাথে সম্পৃক্ততা

অনেকেই মনে করেন সুদের মাধ্যমে সম্পদ জ্যামিতিক হারে বাড়ে, কিন্তু সুদের শেষ পরিণতি হলো ধ্বংস ও বরকতহীনতা। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন…

‘আল্লাহ সুদকে ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করেন এবং দান-সদকাকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে দেন।’ (সূরা বাকারা: ২৭৬)

আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর না নেওয়া

রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় না রাখা রিজিক কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ। আল্লাহর রাসুল (স.) এর চমৎকার একটি সমাধান দিয়ে বলেছেন…

‘যে ব্যক্তি নিজের জীবিকা বা রিজিক প্রশস্ত করতে চায় এবং দীর্ঘায়ু লাভ করতে পছন্দ করে, সে যেন অবশ্যই আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬)

ইস্তিগফার বা ক্ষমাপ্রার্থনায় উদাসীনতা

নিয়মিত আল্লাহর কাছে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা না চাওয়া রিজিক সংকটের কারণ হতে পারে। হযরত নূহ (আ.) তার জাতিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন…

‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। (তাহলে) তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিয়ে তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন।’ (সূরা নূহ: ১০-১২)

বেহিসাবি খরচ ও অপচয়

প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করা কিংবা বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেওয়া বরকত চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ। আল্লাহ তাআলা অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না। কুরআনে এসেছে…

‘তোমরা আহার করো ও পান করো, তবে অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপব্যয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সূরা আরাফ: ৩১)

জাকাত আদায়ে অবহেলা

যাদের ওপর জাকাত ফরজ, তারা যদি তা আদায় না করেন, তবে পুরো সম্পদ অপবিত্র হয়ে যায় এবং বরকত উঠে যায়। রাসুলুল্লাহ (স.) এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে বলেছেন…

‘যখন কোনো সমাজ বা জাতি জাকাত দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তখন আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। যদি পৃথিবীতে অবলা পশুপাখি না থাকত, তবে হয়তো কখনোই আর বৃষ্টি হতো না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০১৯)

প্রকৃতপক্ষে, সম্পদের সংখ্যা বা পরিমাণ দেখে কখনো মানুষের সুখ মাপা যায় না; আসল সুখ আসে আল্লাহর দেওয়া বরকত থেকে। জীবনে সত্যিকারের সচ্ছলতা ও মনের শান্তি ফিরিয়ে আনতে চাইলে আমাদের অবশ্যই হালাল পথে চলতে হবে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে এবং সম্পদের হক (জাকাত-সদকা) নিয়মিত আদায় করতে হবে। উপার্জনে বরকত ধরে রাখতে উপরোক্ত ১০টি ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে নিজেদের দূরে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।