জীবিকার অপ্রতুলতা কিংবা বরকতের অভাব দূর করতে আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করা মুমিনের অন্যতম হাতিয়ার। দোয়া করার সময় দুই হাত তুলে দোয়া করা একটি সুন্নতে মুআক্কেদা। নবী করিম (সা.) থেকে রিজিক ও বরকত বৃদ্ধির এমন একটি চমৎকার ও ব্যাপক অর্থবোধক দোয়া বর্ণিত হয়েছে, যা একজন মুমিনের দুনিয়া ও আখেরাতের সব চাহিদা পূরণ করতে পারে।
দোয়া ও উচ্চারণ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লি যাম্বি, ওয়া ওয়াস্তি লি ফী দারী, ওয়া বারিক লি ফী রিযকী।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিন, আমার ঘর প্রশস্ত করে দিন এবং আমার রিজিকে বরকত দান করুন।
যে হাদিসে দোয়াটি বর্ণিত হয়েছে
হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন তিনি নবীজিকে (সা.) অজুর পানি এনে দিলেন এবং তিনি অজু করলেন। এরপর তিনি নবীজিকে এই দোয়াটি করতে শুনলেন: ‘আল্লাহুম্মাগফির লি যাম্বি, ওয়া ওয়াস্তি লি ফী দারী, ওয়া বারিক লি ফী রিযকী।’
তখন আবু মুসা আশআরী (را.) বললেন, ‘হে আল্লাহর নবী! আমি তো আপনাকে এই এই দোয়া করতে শুনেছি।’ উত্তরে নবীজি (সা.) বললেন, ‘এই দোয়া থেকে কিচ্ছু বাদ পড়েছে?’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা)
দোয়াটির গভীর অর্থ ও তাৎপর্য
এই সংক্ষিপ্ত দোয়াটি অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী অর্থ বহন করে। দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যাণ যেন এর মাঝে নিহিত রয়েছে। খোদ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন যে, এই দোয়ায় বান্দার দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণমূলক কোনো প্রার্থনাই বাদ যায়নি। দোয়াটির প্রতিটি অংশের চমৎকার ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো:
গুনাহ ক্ষমা (আত্মার পবিত্রতা)
দোয়ার প্রথম অংশে বান্দা মহান আল্লাহর দরবারে তার সমস্ত পাপ ও ত্রুটি মোচনের আকুতি জানায়। পাপের কালিমা যখন মানুষের জীবনে স্তূপীকৃত হয়, তখন তা ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরকে কঠিন করে তোলে। এটি মানুষের বর্তমান জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয় এবং পরকালের ঠিকানা জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। তাই পার্থিব কোনো প্রশান্তি বা রিজিক চাওয়ার আগে নিজের আত্মাকে পাপমুক্ত ও পবিত্র করে নেওয়া মুমিনের কাছে সর্বাগ্রে কাম্য।
ঘরের প্রশস্ততা (দুনিয়া ও আখেরাতের প্রশান্তি)
দ্বিতীয় অংশে দুনিয়ার আবাসস্থলকে প্রশস্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার প্রার্থনা করা হয়েছে। সংকীর্ণ বাসস্থান বা অস্বস্তিকর পরিবেশ মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও পেরেশানি তৈরি করে।
এর পাশাপাশি, এই প্রার্থনার অন্তর্নিহিত আরেকটি সুমহান অর্থ হলো—পরকালের প্রথম ঠিকানা ‘কবর’ প্রশস্ত হওয়া, যাতে তা জান্নাতের সুশীতল বাগিচায় পরিণত হয়। একই সাথে আখেরাতের চূড়ান্ত ঠিকানা জান্নাতকেও যেন আল্লাহ প্রশস্ত ও সুগম করেন। এর মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তি দুনিয়া ও আখেরাত—উভয় জাহানেই স্বস্তি ও প্রশান্তি কামনা করেন।
রিজিকে বরকত (হালাল ও তৃপ্তিদায়ক উপার্জন)
দোয়ার শেষাংশে বান্দা তার উপার্জনে বরকতের প্রার্থনা জানায়। এর অর্থ কেবল সম্পদের পাহাড় জমে যাওয়া নয়; বরং এর প্রকৃত তাৎপর্য হলো:
রিজিক সম্পূর্ণ হালাল ও পবিত্র হওয়া।
সেই উপার্জনে আল্লাহর কল্যাণ ও প্রাচুর্য থাকা।
অল্প উপার্জনেও মন তৃপ্ত থাকা এবং অবৈধ সম্পদের প্রতি কোনো লোভ না জন্মানো।
সর্বদা সন্তুষ্টচিত্তে ও সুখে জীবনযাপন করতে পারা।
দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী প্রাপ্তির পেছনে অন্ধের মতো ছোটার চেয়ে আল্লাহর দরবারে এমন বরকতময় দোয়া করা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, যেখানে স্বয়ং বিশ্বনবী (সা.) এই দোয়ায় দুনিয়া ও আখেরাতের সব কল্যাণ খুঁজে পেয়েছেন, সেখানে নিয়মিত এই আমলটি আমাদের জীবনকে প্রকৃত প্রশান্তি ও বরকতে পরিপূর্ণ করে তুলতে পারে। তাই আসুন, দৈনিক জীবনে সালাতের পর কিংবা একান্ত মোনাজাতে এই ছোট্ট অথচ সর্বাঙ্গীন সুন্দর দোয়াটি নিয়মিত পাঠ করার অভ্যাস গড়ি।