Monday 12 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ইকোপার্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে জীববৈচিত্র্যের ওপর

তানজিদ শুভ্র
১১ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:১৬

বনের ভেতর দিয়ে হাঁটার পথ, একটা কৃত্রিম লেক, তাতে নৌকা ভাসানোর ব্যবস্থা, একটা ওয়াচ টাওয়ার আর কিছু বসার বেঞ্চ বাংলাদেশে ইকোপার্ক বললে সাধারণত মানুষের চোখে এই ছবিটাই ভেসে ওঠে। ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার একটা জায়গা, ছবি তোলার পটভূমি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটা বনভূমিকে সরকার যখন ইকোপার্ক ঘোষণা করে, তখন তার মূল উদ্দেশ্য কি আসলেই মানুষের বিনোদন, নাকি অন্য কিছু। উত্তরটা জানলে অনেকেই অবাক হবেন। কারণ কাগজে-কলমে ইকোপার্কের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য বিনোদন নয়, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ।

ইকোপার্ক শব্দটি এসেছে ইংরেজি ‘ইকোলজিক্যাল পার্ক’ থেকে। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, এটি এমন এক প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে তোলা সংরক্ষিত এলাকা, যেখানে জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব না ফেলেই সীমিত পরিসরে বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়। বাংলাপিডিয়ায় বর্ণিত ইকোপার্ক স্থাপনের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে প্রথমেই আছে হুমকির সম্মুখীন ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ প্রজাতির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষরোপণ, বিদ্যমান উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্যের সংরক্ষণ, এবং দেশীয় প্রজাতির জিনগত ভান্ডার রক্ষা। ইকো-ট্যুরিজম বা শিক্ষা-গবেষণার সুযোগ তৈরি করাও এর একটা উদ্দেশ্য, কিন্তু সেটি প্রধান নয়, বরং সংরক্ষণের পরিপূরক একটি দিক মাত্র।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ ইকোপার্কের নকশাতেই লেখা আছে, বিনোদন এখানে অতিথি, আর জীববৈচিত্র্য গৃহকর্তা। সমস্যা হলো, বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে এই সম্পর্কটা প্রায়ই উল্টে যায়।

বিশ্বব্যাপী বন্যপ্রাণীর সংখ্যা যেভাবে কমছে, তার হিসাব রীতিমতো ভীতিকর। বিশ্ব প্রকৃতি তহবিলের (ডব্লিউডব্লিউএফ) ২০২৪ সালের লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্ট বলছে, ১৯৭০ থেকে ২০২০ এই পঞ্চাশ বছরে পর্যবেক্ষিত মেরুদণ্ডী বন্যপ্রাণী প্রজাতির জনসংখ্যা গড়ে ৭৩ শতাংশ কমে গেছে। প্রায় ৩৫ হাজার প্রাণী জনগোষ্ঠীর ওপর জরিপ চালিয়ে তৈরি এই সূচকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্বাদুপানির প্রাণী, যেখানে হ্রাসের হার ৮৫ শতাংশ। স্থলজ প্রাণীর ক্ষেত্রে এই হার ৬৯ শতাংশ, সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ।

এই সংকট মোকাবিলায় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য কনভেনশনের (সিবিডি) সম্মেলনে প্রায় দুইশর কাছাকাছি দেশ কুনমিং-মন্ট্রিয়ল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্কে সই করে। এই চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য পরিচিত “থার্টি বাই থার্টি” নামে, অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের অন্তত ৩০ শতাংশ স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকা কার্যকর সংরক্ষণের আওতায় আনা। এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু নতুন সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়, ঘোষিত এলাকাগুলো প্রকৃত অর্থে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ইকোপার্কের মতো ছোট আকারের সংরক্ষিত এলাকাগুলো এই বৈশ্বিক লক্ষ্যের একটি অংশ হতে পারত, যদি তারা তাদের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে না যেত।

বাংলাদেশের মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ২৫ লাখ ২০ হাজার হেক্টর, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৭ শতাংশ। এর মধ্যে বন অধিদপ্তরের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকা বনভূমি প্রায় ১৫ লাখ ২০ হাজার হেক্টর, অর্থাৎ দেশের আয়তনের মাত্র সাড়ে দশ শতাংশের মতো। এই সংকুচিত বনভূমির ওপরই নির্ভর করছে দেশের অধিকাংশ স্থলজ বন্যপ্রাণীর টিকে থাকা।

বন অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের যৌথ জরিপে (২০১৪-১৫) দেশের ১ হাজার ৬১৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী পর্যালোচনা করা হয়েছিল। সেই জরিপ অনুযায়ী গত একশ বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ৩১ প্রজাতির প্রাণী চিরতরে হারিয়ে গেছে। এ ছাড়া ৫৬ প্রজাতি মহাবিপন্ন, ১৮১ প্রজাতি বিপন্ন এবং ১৫৩ প্রজাতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো ২০০০ সালের আগের জরিপের তুলনায় অনেক বেশি, যা স্পষ্ট করে দেয় গত দেড়-দুই দশকে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী পরিস্থিতি কতটা দ্রুত খারাপ হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইকোপার্ক আসলে একটা সুযোগ। অবশিষ্ট বনভূমির মধ্যে যেটুকু তুলনামূলক অক্ষত অংশ টিকে আছে, তাকে সুরক্ষিত ঘোষণা দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে দেওয়ার সুযোগ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ইকোপার্ক ঘোষণার পর মনোযোগ চলে যায় অবকাঠামোর দিকে—সীমানাপ্রাচীর, প্রধান ফটক, টিকিট কাউন্টার, ওয়াচ টাওয়ার, লেক খনন, নৌবিহারের ব্যবস্থা। এসবের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই, দর্শনার্থীর জন্য ন্যূনতম সুবিধা লাগেই। কিন্তু বন গবেষকদের একটা বড় অংশের আপত্তি হলো, যখন অবকাঠামো নির্মাণই মূল কর্মকাণ্ড হয়ে দাঁড়ায় আর বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, প্রজাতি জরিপ বা দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের মতো কাজগুলো পেছনে পড়ে থাকে।

সাংবাদিকতার তথ্যে এমন উদাহরণও উঠে এসেছে, যেখানে সরকারি তহবিলের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে নিছক সৌন্দর্যবর্ধনে, অথচ এক দশকের বেশি সময় পরও সেই এলাকা থেকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য কোনো ফল পাওয়া যায়নি। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে, শুধু ইকোপার্ক ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়, তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা না থাকলে পুরো উদ্যোগ তার লক্ষ্য থেকে সরে যেতে পারে।

ইকোপার্ককে যদি শুধু পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তিনটি ঝুঁকি সামনে আসে। প্রথমত, দর্শনার্থীর চাপ, শব্দদূষণ ও প্লাস্টিক বর্জ্য বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণে ব্যাঘাত ঘটায়, ফলে যে প্রাণী রক্ষার জন্য এলাকাটি সংরক্ষিত হলো, সেই প্রাণীই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, লেক খনন বা রাস্তা নির্মাণের মতো অবকাঠামো প্রকৃতপক্ষে বনভূমির টুকরো টুকরো ভাগ করে ফেলে, যা বাস্তুতন্ত্রের সংযোগ নষ্ট করে। তৃতীয়ত, স্থানীয় জনগোষ্ঠী যদি সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অংশীদার না হয়ে শুধু নিয়ন্ত্রণের শিকার হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বন রক্ষার সামাজিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে সম্ভাবনাও কম নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত করে গড়া প্রকৃতি-কেন্দ্রিক পর্যটন এলাকা টেকসই হয়েছে, কারণ তখন বন রক্ষা করাটাই স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশেও যদি ইকোপার্ক পরিকল্পনায় জীববৈচিত্র্য জরিপ, প্রজাতি পুনরুদ্ধার কর্মসূচি ও স্থানীয় মানুষের জীবিকাকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া যায়, তাহলে এই মডেল প্রকৃত অর্থে সফল হতে পারে।

কয়েকটি বিষয়ে মনোযোগ দিলে ইকোপার্কের প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জন সহজ হতে পারে। প্রথমত, প্রতিটি ইকোপার্ক ঘোষণার আগে ও পরে বৈজ্ঞানিক জীববৈচিত্র্য জরিপ বাধ্যতামূলক করা দরকার, যাতে সংরক্ষণের অগ্রগতি আসলেই পরিমাপযোগ্য হয়। অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্তে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতামতকে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে বাধ্যতামূলক করা গেলে অপরিকল্পিত নির্মাণ অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও প্রথাগত অধিকারকে পরিকল্পনার শুরু থেকেই বিবেচনায় নেওয়া জরুরি, যাতে সংরক্ষণ আর জীবিকা একে অপরের প্রতিপক্ষ না হয়ে দাঁড়ায়। বরাদ্দকৃত তহবিলের কত অংশ প্রকৃত সংরক্ষণ কাজে এবং কত অংশ অবকাঠামোয় ব্যয় হচ্ছে, তার স্বচ্ছ হিসাবও প্রকাশ করা উচিত, যাতে জনগণ বুঝতে পারে অর্থ আসলে কোন খাতে যাচ্ছে। সবশেষে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, যাতে কোনো ইকোপার্ক সত্যিই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সফল হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা যায়।

একটা ঝুলন্ত সেতু বা কৃত্রিম লেক মানুষকে কয়েক ঘণ্টার আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু একটা প্রজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানো একটা জাতির জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্মের সম্পদ রক্ষা করার সমান। ইকোপার্ক শব্দের প্রথম অংশটাই মনে করিয়ে দেয়, এখানে ইকোলজি বা বাস্তুতন্ত্রই মূল বিষয়, পার্ক বা বিনোদন তার একটা অনুষঙ্গ মাত্র। বিশ্বজুড়ে জীববৈচিত্র্য যখন নজিরবিহীন গতিতে কমছে, তখন বাংলাদেশের প্রতিটি ইকোপার্ককে যদি সত্যিকারের সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে তা শুধু কয়েকটা প্রজাতিকে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার একটা পথও দেখাবে। নইলে ইকোপার্ক শুধু নামেই থেকে যাবে, বাস্তবে হয়ে উঠবে আরেকটা বিনোদন পার্ক, যার ভেতরে হয়তো একদিন আর কোনো বন্যপ্রাণীই খুঁজে পাওয়া যাবে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

সারাবাংলা/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর