Monday 12 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মাত্র ৪০ মিনিটে প্রকৃতির কোলে: রূপগঞ্জের জিন্দা বিলে লাল পদ্মর উৎসব

তাহমিনা ইসলাম
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮:৪৪ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯:২২

ঢাকার ব্যস্ততা, যানজট আর কংক্রিটের নগরজীবন থেকে মাত্র ৪০ মিনিটের দূরত্বে লুকিয়ে আছে এক টুকরো প্রকৃতির স্বর্গ। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার জিন্দা বিল যেন বর্ষা ও শরতের সন্ধিক্ষণে প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। দিগন্তজুড়ে ফুটে থাকা লাল শাপলা, গোলাপি পদ্ম, সবুজ পাতার বিস্তৃত চাদর আর পাখির কোলাহলে মুখর এই বিল প্রতি বছরই হাজারো প্রকৃতিপ্রেমী, আলোকচিত্রী ও ভ্রমণপিপাসুর প্রিয় গন্তব্য হয়ে ওঠে।

আগস্ট থেকে নভেম্বর এই চার মাস জিন্দা বিল যেন নতুন রূপে সেজে ওঠে। সূর্যোদয়ের প্রথম আলো যখন শিশিরভেজা পাতায় এসে পড়ে, তখন লাল শাপলার পাপড়িগুলো ধীরে ধীরে মেলে ধরে তাদের সৌন্দর্য। সকালের কোমল আলোয় বিলের জলরাশি, সবুজ পাতার ভেলা আর অসংখ্য শাপলা-পদ্ম মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক অনন্য নৈসর্গিক দৃশ্য। এই সৌন্দর্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

বিজ্ঞাপন

প্রকৃতির বুকে হাজার বিঘার সৌন্দর্য

রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের জিন্দা এলাকার লাউয়াল, আড়িয়ল ও পুরাকুরা বিল মিলিয়ে প্রায় হাজার বিঘা জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় শাপলা ও পদ্ম। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ২০০ একর বিস্তৃত এই বিল বছরের একটি বড় সময় জুড়ে ফুলে ফুলে ভরে থাকে।

এখানে শুধু লাল শাপলাই নয় দেখা মেলে সাদা ও বেগুনি শাপলারও। কোথাও পদ্মের সারি, কোথাও শাপলার বিশাল বিস্তার। বাতাসে ভেসে আসে কাদামাটির গন্ধ, দূরে শোনা যায় নানা প্রজাতির পাখির ডাক। প্রকৃতি যেন একসঙ্গে রং, গন্ধ আর শব্দের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে এই বিলে।

রাজধানীর খুব কাছেই প্রকৃতির টান

ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোড থেকে গাড়িতে মাত্র ৪০ মিনিটের পথ। মদনপুর-গাজীপুর সড়কের দাউদপুর এলাকায় পলখান আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে পূর্বদিকে এগোলেই চোখে পড়বে সবুজের মাঝে লাল রঙের বিস্ময়। জিন্দা মধ্যপাড়া সড়কের দুই পাশে বিস্তৃত শাপলা-পদ্মের বিল যেন পথ চলতি মানুষকেও থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।

দিনভ্রমণের জন্য এটি আদর্শ একটি স্থান। সকালে গিয়ে দুপুরের মধ্যেই ফিরে আসা সম্ভব। তবে যারা প্রকৃত সৌন্দর্যের পূর্ণতা দেখতে চান, তাদের জন্য ভোরের সময়টিই সবচেয়ে উপযুক্ত।

ভোরের আলোয় অন্যরকম জিন্দা বিল

সূর্য ওঠার আগ মুহূর্ত থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত শাপলার সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে। তখন ফুলগুলো পুরোপুরি প্রস্ফুটিত থাকে। সূর্যের আলো পানির ওপর প্রতিফলিত হয়ে লাল শাপলাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। চারদিকে শুধু লাল আর সবুজের মায়াবী সমারোহ।

অনেক দর্শনার্থী এই সময় নৌকায় করে বিলের গভীরে চলে যান। পানির ওপর ভাসতে ভাসতে শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করা, ছবি তোলা কিংবা নিঃশব্দে প্রকৃতির শব্দ শোনা সব মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

নৌকাভ্রমণেই প্রকৃত আনন্দ

জিন্দা বিলে গড়ে উঠেছে পদ্মা-শাপলা রিসোর্ট। এখানে রয়েছে কাঠের তৈরি ছোট ছোট নৌকা। প্রতিটি নৌকায় চার থেকে পাঁচজন বসতে পারেন। ঘণ্টাপ্রতি প্রায় ৩০০ টাকা ভাড়ায় পুরো বিল ঘুরে দেখা যায়।

নৌকা যখন ধীরে ধীরে শাপলার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায়, তখন মনে হয় যেন ফুলের সমুদ্রে ভাসছেন। আলোকচিত্রীদের কাছে এটি যেন স্বর্গ। বর্ষা ও শরৎ মৌসুমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অসংখ্য ছবির পেছনের দৃশ্যপট এই জিন্দা বিল।

পর্যটনের পাশাপাশি জীবিকারও উৎস

জিন্দা বিল শুধু দর্শনীয় স্থান নয় এটি স্থানীয় মানুষের জীবিকারও বড় অবলম্বন। বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন পর্যটকদের নৌকায় ঘুরিয়ে তিনি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। অনেক মাঝির সংসার চলে এই মৌসুমি আয়ের ওপর।

কৃষকদের কয়েক বিঘা জমি রয়েছে এই বিলে। প্রতিদিন শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করেন। ১৫ থেকে ২০টি শাপলার একটি আঁটি ৫০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। এতে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় হয়। শুকনো মৌসুমে একই জমিতে ধান চাষ করা হয়। শতাধিক পরিবার শাপলা, মাছ ও কৃষির ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে।

দর্শনার্থীদের কাছে বাড়ছে জনপ্রিয়তা

রাজধানী থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা আনিসুর রহমান বলেন, এত কাছে এত সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ আগে কল্পনাও করেননি। এই বছরই সন্তানদের নিয়ে এখানে আসেন। ছোট নৌকায় শাপলার মাঝে ঘুরে বেড়ানো শিশুদের কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয়।

সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় শুক্র ও শনিবার দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পরিবার, বন্ধু কিংবা ফটোগ্রাফি টিম সবাই ভিড় করেন এই ফুলের রাজ্যে।

নিরাপদ ভ্রমণের নতুন ঠিকানা

পদ্মা-শাপলা রিসোর্টের উদ্যোক্তা নুরুল ইসলাম জানান, একসময় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এলেও নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার অভাব ছিল। সেই সমস্যার সমাধান করতেই রিসোর্টটি গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে নৌকা, বসার ব্যবস্থা, বিশ্রাম ও নিরাপদ পরিবেশ থাকায় পরিবার নিয়ে সহজেই ঘুরতে আসছেন দর্শনার্থীরা। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও বেড়েছে।

ভ্রমণ পরিকল্পনায় যা মনে রাখবেন

ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

জিন্দা বিল ঘুরে দেখার সবচেয়ে ভালো সময় আগস্ট থেকে নভেম্বর। এ সময় বিলজুড়ে লাল শাপলা ও গোলাপি পদ্মে ভরে ওঠে জলাভূমি। বর্ষার শেষ ভাগ এবং শরতের শুরুতে ফুলের সমারোহ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

কখন গেলে সবচেয়ে সুন্দর লাগবে?

ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত সময়টি সবচেয়ে উপযুক্ত। সূর্য ওঠার পর শাপলা পুরোপুরি প্রস্ফুটিত থাকে এবং সকালের কোমল আলোয় ছবি তোলার জন্যও এটি আদর্শ সময়। দুপুরের দিকে অনেক শাপলা আংশিক বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করে এবং রোদও বেশি থাকে।

কীভাবে যাবেন?

ব্যক্তিগত গাড়িতে

ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোড থেকে ৩০০ ফিট সড়ক ধরে কাঞ্চন ব্রিজের দিকে যান। এরপর মদনপুর–গাজীপুর সড়ক ধরে দাউদপুর বাজার পর্যন্ত যেতে হবে।
দাউদপুরে পলখান আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে পূর্বদিকে জিন্দা মধ্যপাড়া সড়ক ধরে কয়েক মিনিট এগোলেই জিন্দা বিল এলাকায় পৌঁছে যাবেন। যানজট না থাকলে পুরো পথ পাড়ি দিতে প্রায় ৪০–৫০ মিনিট সময় লাগে।

মোটরসাইকেলে

ঢাকার যেকোনো এলাকা থেকে ৩০০ ফিট সড়ক হয়ে একই পথে সহজেই যাওয়া যায়। মোটরসাইকেল পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।

পাবলিক বাসে

ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোড, বাড্ডা, গুলিস্তান বা যাত্রাবাড়ী থেকে মদনপুর বা কাঞ্চনগামী বাসে উঠতে পারেন।
দাউদপুর বাজার অথবা স্থানীয়দের পরামর্শ অনুযায়ী জিন্দা বিলের কাছাকাছি নেমে পড়ুন।
সেখান থেকে রিকশা, অটোরিকশা (সিএনজি) বা ইজিবাইকে ১০–১৫ মিনিটে জিন্দা বিলে পৌঁছে যাওয়া যায়।

রাইড শেয়ারিং অ্যাপ

উবার, পাঠাও বা ইনড্রাইভে সরাসরি ‘জিন্দা বিল’ বা ‘পদ্মা-শাপলা রিসোর্ট, জিন্দা’লোকেশন দিয়ে বুক করলেও সহজে পৌঁছানো যায়।

নৌকা ভাড়া

বিল ঘুরে দেখার জন্য ছোট কাঠের নৌকা পাওয়া যায়।
একটি নৌকায় সাধারণত ২–৩ জন বসতে পারেন। ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া প্রায় ৩০০ টাকা। তবে পর্যটকের চাপ ও মৌসুমভেদে কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। ভিড়ের দিনে আগে থেকেই নৌকা ঠিক করে নেওয়া ভালো।

সঙ্গে যা রাখবেন

– পর্যাপ্ত পানীয় পানি
– টুপি বা ক্যাপ
– ছাতা বা রেইনকোট (বর্ষাকালে)
– সানস্ক্রিন
– মশার স্প্রে বা রিপেলেন্ট
– ক্যামেরা বা মোবাইলের অতিরিক্ত চার্জ/পাওয়ার ব্যাংক
– আরামদায়ক স্যান্ডেল বা জুতা

ভ্রমণের সময় করণীয়

নৌকায় ওঠার সময় শিশু ও সাঁতার না জানা ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ নজর রাখুন। মাঝির নির্দেশনা মেনে চলুন এবং নৌকায় অযথা দাঁড়াবেন না। স্থানীয় মানুষের জমি বা ফসলের ক্ষতি করবেন না। পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক, বোতল বা অন্য কোনো ময়লা বিলে ফেলবেন না। শাপলা ও পদ্ম অপ্রয়োজনে না ছিঁড়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখুন।

খাবারের ব্যবস্থা

জিন্দা বিলের আশপাশে ছোটখাটো চা-নাশতার দোকান রয়েছে। তবে পরিবার নিয়ে গেলে হালকা খাবার ও পর্যাপ্ত পানি সঙ্গে রাখাই ভালো। দুপুরের খাবারের জন্য দাউদপুর বাজার বা রূপগঞ্জ এলাকার স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবহার করতে পারেন।

প্রকৃতিকে ভালোবাসার এক অনন্য ঠিকানা

বাংলাদেশের জলাভূমির সৌন্দর্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ রূপগঞ্জের জিন্দা বিল। এখানে প্রকৃতি শুধু চোখ জুড়ায় না, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকারও অংশ হয়ে আছে। নগরজীবনের ক্লান্তি দূর করতে, পরিবার নিয়ে একদিনের ভ্রমণে কিংবা ক্যামেরাবন্দি করতে চাইলে জিন্দা বিল হতে পারে অসাধারণ একটি গন্তব্য। লাল শাপলা আর পদ্মের এই রাজ্যে একবার গেলে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করবে এমনটাই বলছেন যারা একবার অন্তত এই বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন।

ছবি: লেখক

সারাবাংলা/টিএম/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

তাহমিনা ইসলাম - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর