Sunday 04 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জলের গ্রাম অন্তেহরিতে জলযাত্রা

ইয়াসীন সেলিম
৪ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:৩০

শ্রাবণের শেষ দিন। ভাদ্র মাসের কয়েকদিন আগে থেকেই সূর্য ভয়ানক উত্তপ্ত। গরমে একদম অতিষ্ট সবাই। আষাঢ়-শ্রাবণ টানা বৃষ্টি হয়েছে এবার। মাঠ-ঘাট, নদ-নদী, হাওর-বিল পানিতে পরিপূর্ণ। তাই অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম কাছেই কোনো হাওরে ঘুরতে যাব। মৌলভীবাজার শহর থেকে সবেচেয়ে কাছে কাওয়াদীঘি হাওর। তারই তীরে অসংখ্য জনপদের মধ্যে একটা নান্দনিক ভাসমান গ্রাম হলো অন্তেহরি। সেটা দেখতেই আজ যাচ্ছি আমরা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির একঝাঁক ভ্রমণপ্রেমী। ঠিক বিকেল তিনটায় ২৬ জনের একটা বহর রওনা হলাম মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের অন্তেহরি গ্রামের দিকে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী শহরের মনু নদের ওপর নির্মিত চাঁদনীঘাট সেতু-সংলগ্ন সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে চারটা সিএনজি করে ২২ জন সুহৃদ রওনা দিই কাদিপুরের দিকে। বাকি চারজন বাইক ও অন্যান্য স্থানীয় বাহনে যোগ দেন আমাদের সাথে। শহর পেরিয়ে গ্রামে ঢুকতেই সবুজের সমারোহ চোখে পড়তে শুরু করে। সদ্য গজানো ধানক্ষেত, তেপান্তরের মাঠ আর নান্দনিক সব বসতবাড়ির মাঝখান দিয়ে মসৃন রাস্তা ধরে দ্রুত পৌঁছে যাই কাদিপুর স্ট্যান্ডে। সেখানেই নৌকার ঘাট। মাঝিদের সাথে কথা বলে আমরা তিনটা নৌকা নিয়ে নিই সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘোরাঘুরির জন্য।

বিজ্ঞাপন

জলের গ্রাম অন্তেহরি মৌলভীবাজারের বিখ্যাত ও সুবিশাল কাউয়াদীঘি হাওরের একটি অংশ। বছরের ৬ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকে বলে এই গ্রামকে জলের গ্রাম বা সোয়াম্প ভিলেজ বলা হয়। সিলেটের রাতারগুল জলাবনের মতো এখানে ঘন জঙ্গল না থাকলেও এখানেও আছে অনেক জলজ গাছপালা। হিজল, করচ, তমালসহ নানা ধরনের বৃক্ষরাজির সাথে জলচর প্রাণিদের আবাসস্থল এই হাওরাঞ্চল। দেশীয় মাছের বিচরণস্থল ও উৎস এই জলাভূমি। আছে গাংচিল, বক, পানকৌড়িসহ নানাজাতের পাখি। সবচেয়ে অবাক বিষয় হলো এখানকার জলেভাসা বাড়িগুলো। চারদিকে জল, মাঝখানে একেকটি বাড়ি। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যাতায়াতের মাধ্যম হলো নৌকা ও বাঁশের সাঁকো। তবে শীতকালে পানি শুকিয়ে গেলে গ্রামটিতে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করা যায়। তখন বনবিড়াল, শিয়ালসহ অনেক বণ্যপ্রাণিও দেখা যায় এখানে।

আমাদের নৌকা ছুটে চলে বিস্তীর্ণ হাওরের দিকে। ভ্রমণসঙ্গী শিল্পী রথীন্দ্র বিশ্বাস রথির দোতারা আর বিজিত দত্তর বাজানো খঞ্জনিতে শিল্পী জয়দ্বীপ রায় রাজুর গানের টানে মুখরিত হয়ে ওঠে হাওরের স্বচ্ছ, সুশীতল জলের বুক। একের পর এক গানে গলা মেলাই আমরাও। হঠাৎ দেখি আকাশে গাংচিল উড়ে যাচ্ছে তার বিস্তীর্ণ ডানা মেলে। পাশ দিয়ে একজোড়া সাদা বক মাছের সন্ধানে জলের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা ভেসে বেড়াতে থাকি হাওরের জলে। যে দিকে চোখ যায় শুধু জল আর জল। মনে হয় হাওর নয়, এক মহাসমুদ্রে চলে এসেছি। দূরে আকাশে শুভ্র-সফেদ মেঘেদের দল ভেসে বেড়াচ্ছে, কোথাও আবার আকাশের নীল এসে মিশেছে হাওরের জলে। হাওরের জলের রঙ আর আকাশের নীল মিলেমিশে একাকার। সূর্য একদম মুখে এসে লাগছিল আমাদের। কিন্তু হাওরের সতেজ হাওয়ায় সূর্যর তাপ খুব একটা খারাপ অনুভূতি দেয়নি। একটা দৃশ্য খুব মুগ্ধ করছিল। যখন সূর্য পানিতে প্রতিফলিত হচ্ছিল, সেই দৃশ্যটা দারুণ ঘোরলাগায় আচ্ছন্ন করেছিল আমাদের। মনে হচ্ছিল সূর্যটা যেন জলের ওপর ভাসছে! ভ্রমণসঙ্গীদের কেউ কেউ শাপলা, পদ্ম, শালুক, পানিফল তুলছিল। আরেক দিকে জেলেরা জাল ফেলে ধরছে হাওরের সুস্বাদু তাজা মাছ। অনেকদিন পর যেন আমরা শৈশবে ফিরে গেলাম।

শেষ বিকেলের দিকে সূর্য চলে আসে একদম নিচে। সুবিশাল হাওরে যেন লাল টকটকে সূর্যটা আমাদের ডেকে বলছে, এবার তীরে ওঠার পালা। আমরা নৌকা নিয়ে চলে আসি অন্তেহরির ছোট্ট বাজারে। এখানেই জলে ডুবে থাকা মানুষেরা নিত্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সারেন রোজ। বাজারের পাশেই একটি পাকা ঘাট। সেখানে আমাদের বসার আয়োজন হয়। কবিতাপাঠ, আবৃত্তি, আলোচনা, আড্ডা চলতে থাকে অনেকক্ষণ। সুরের মুর্ছনা হাওরের বুকে ঢেউ তোলে। বাজার থেকে লোকজনের ভীড় জমে যায়।

বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। হাওরের জনপদও এখন বৈদ্যুতিক আলোতে ভরপুর। তাই অন্ধকার কিংবা নির্জনতা খুব একটা নেই এখানে। অন্তেহরি বাজারের একটি স্থানীয় হোটেলে গরম গরম ডালপুরি, সিঙাড়া, সমুচা ভাজা হচ্ছিল। সেখান অভিযাত্রীদের নিয়ে ভোজনপর্ব শেষে মাঝিরা আমাদের নামিয়ে দিলো কাদিপুর ঘাটে। এখানে অবশ্য ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে। গ্যাসের সংকটে স্ট্যান্ডে সিএনজি এখন নেই বললেই চলে। হেঁটে হেঁটেই রওনা দিলাম পাশের জগৎপুর বাজারের দিকে। সেখান থেকে সিএনজি ধরে আসতে হবে শহরে।

কবি শামসুর রাহমান তার ‘এই সন্ধ্যেবেলা’ কবিতায় লিখেছিলেন, “এই সন্ধ্যেবেলা তুমি ছিলে না আমার পাশে খুব/অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে এবং চতুর্দিকে ছিল ধু ধু/মরুভূর দীর্ঘশ্বাস, নিঃসঙ্গতা আমাকে লেহন/করছিলো কুকুরের মতো, আমি বারবার ডুব/দিচ্ছিলাম অসহায়তার জলে। ঘাটে ছিলো শুধু/তলাহীন নৌকা এক, কিয়দ্দূরে ভয়ঙ্কর বন”। একদল পর্যটক হাওরের বুকে সাবমার্সিবল রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছে গন্তব্যের দিকে। পেছনে রেখে আসছে স্মৃতি। জলের গ্রামে তপ্ত বিকেলে জলযাত্রার দারুণ সুন্দর সব স্মৃতি।

যেভাবে যাবেনঃ ঢাকা কিংবা দেশের যে কোনো জায়গা থেকে ট্রেনে, বাসে আসতে হবে মৌলভীবাজার শহরে। ফ্লাইটে আসতে হলে সিলেট শহর হয়ে আসতে হবে। মৌলভীবাজার শহরের চাঁদনীঘাট সেতু থেকে সিএনজি নিয়ে সহজেই চলে যাওয়া যায় অন্তেহরিতে। চাইলে কেউ প্রাইভেট কারেও যেতে পারবেন।

যেখানে থাকবেনঃ মৌলভীবাজার শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে হওয়ায় সহজেই শহরে এসে হোটেলে থাকতে পারবেন। রেস্ট ইন, ওয়েস্টার্ন, মেট্রোসহ স্ট্যান্ডার্ড কিছু হোটেল আছে। শহরতলীতে আছে রাঙাউটি রিসোর্ট। এটা কিছুটা ব্যয়বহুল হলেও থাকা ও অবসর কাটানোর দারুণ একটি জায়গা।

যেখানে খাবেনঃ অন্তেহরি ছোট্ট বাজার, ভালো খাবার হোটেল নেই। তবে চা-নাশতা খেতে পারবেন অনায়াসেই। মৌলভীবাজার শহরে বেশকিছু ভালোমানের বাংলা রেস্টুরেন্ট আছে, যার মধ্যে পানসী, মামার বাড়ি ও শাহ মোস্তফা বিরিয়ানি হাউজ অন্যতম। চাইনিজ ও বিদেশি খাবার খেতে হলে ইট অ্যান্ড মিট রেস্টুরেন্ট, জাইকা ক্যাফে, বেঙ্গল চাইনিজ, সেন্ট্রাল কিচেনসহ বেশকিছু অপশন পেয়ে যাবেন।

লেখক: কবি, লেখক ও ট্রাভেলার

সারাবাংলা/এএসজি
বিজ্ঞাপন

এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ল
৪ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:১৭

আরো

সম্পর্কিত খবর