রংপুর: নগরীতে ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা দখলের চেষ্টার অভিযোগকে কেন্দ্র করে কেব্ল অফিসে হামলা-ভাঙচুর ও ম্যানেজারকে পরিবারসহ গুলি করে হত্যার হুমকির ঘটনায় জেলা যুবদলের সদ্য বহিষ্কার হওয়া সহসাধারণ সম্পাদক তামজিদুর রশিদ গালিব ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আকিবুল রহমান মনুর বিরুদ্ধে দু’টি মামলা হয়েছে। তবে এসব মামলায় এখনো কেউ গ্রেফতার হয়নি।
এর আগে সোমবার (২ মার্চ) বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন কোতয়ালী থানায় ক্যাবল ওয়ান নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠানের জিএম রায়হান আহম্মেদ পরাগ এবং মায়া সাইবার ওয়ার্ল্ডের হিসাব রক্ষক মোহাম্মদ রাসেল পৃথক দুটি মামলা দায়েরের আবেদন করেন।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, রোববার (১ মার্চ) বিকেল ৪টার দিকে নগরের স্টেশন রোডে অবস্থিত ‘ক্যাবল ওয়ান নেটওয়ার্ক’-এর কার্যালয়ে ১৫-২০ জনকে নিয়ে প্রবেশ করেন অভিযুক্ত দুই নেতা। সেখানে ব্যবস্থাপক রায়হান আহম্মেদ পরাগকে মারধর এবং ল্যাপটপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর করা হয়।
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, অফিসে অবস্থানকালে আকিবুল রহমান মনু মুঠোফোনে ‘মায়া সাইবার ওয়ার্ল্ড’-এর ম্যানেজার মাহাদি হাসানকে কল করে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং বলেন, ‘আজকের মধ্যে সমাধান না করলে তোর বাসায় গিয়ে, বেডরুমে ঢুকে বউ-বাচ্চাসহ তোকে গুলি করে আসব।’
পরিবারের দাবি, এটি কেবল ভয়ভীতি প্রদর্শন নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত দখলচেষ্টার অংশ।
অভিযোগের পর রাতেই কেন্দ্রীয় নির্দেশে দুই নেতাকে জেলা যুবদল ও প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। কেন্দ্রীয় সহদফতর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূইয়ার সই করা চিঠিতে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
দলীয় সূত্র বলছে, সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ায় তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রংপুর নগরে ‘মায়া সাইবার ওয়ার্ল্ড’-এর ফিড অপারেটর হিসেবে ‘ক্যাবল ওয়ান নেটওয়ার্ক’-এর মাধ্যমে কামাল কাছনা থেকে দখিগঞ্জ শ্মশান এলাকা পর্যন্ত কেব্ল ও ওয়াই-ফাই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন মহানগর যুবলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর হারুন অর রশিদ। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলায় তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, নতুন সরকার গঠনের পর ব্যবসা হস্তান্তরের জন্য চাপ দেওয়া হয়। রাজি না হওয়ায় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি কামাল কাছনা এলাকায় তাঁদের বৈধ ফিডারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় আগে ৮ জনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। কয়েকদিন পর হারুন অর রশিদের স্ত্রী রেবেকা হারুন সংবাদ সম্মেলন করে দখলচেষ্টা ও হুমকির বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন।
তবে তামজিদুর রশিদ গালিব দাবি করেন, ২০১৫ সাল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট লাইন তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। সে সময় তিনি কারাগারে থাকাকালে হারুন অর রশিদ সেটি দখল করেন বলে তার অভিযোগ।
তিনি বলেন, ‘এটা আমার হক। আমি কোনো অন্যায় করিনি, আলোচনার মাধ্যমে কথা বলেছি।’ হামলার বিষয়ে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন, সংবাদ সম্মেলনে নাম উল্লেখ করায় ‘উচ্চবাচ্য’ হয়েছে।
রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহজাহান আলী জানান, ‘মায়া সাইবার ওয়ার্ল্ড’ ও ‘ক্যাবল ওয়ান নেটওয়ার্ক’ কর্তৃপক্ষ তামজিদুর রশিদ গালিব এবং আকিবুল রহমান মনুর নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ১৫-২০ জনকে আসামি করে দুটি মামলা করেছেন। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে, তদন্ত চলছে, তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রংপুরে কেব্ল-ইন্টারনেট ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণে। কারাবন্দী রাজনৈতিক নেতার ব্যবসা ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের দখলচেষ্টা ও প্রকাশ্য হুমকির ঘটনা নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে রংপুর জেলা যুবদলের সভাপতি নাজমুল আলম নাজু জানান, বিষয়টি কেন্দ্রীয় কমিটি অবগত হওয়ার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আকিবুল রহমান মনু ও সহ-সম্পাদক রহমান গালিবকে সব পদ থেকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় কমিটি। এখন বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হবে।
মহানগর পুলিশ কমিশনার মসজিদ আলী বলেন, ‘ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটে আমরা জব্দ করেছি। এছাড়াও প্রয়োজনীয় আলামত জব্দ করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর মামলার প্রেক্ষিতে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, ব্যবসায়িক বিরোধে রাজনৈতিক প্রভাব ও সহিংসতার সংস্কৃতি বন্ধে কঠোর নজরদারি জরুরি।