রংপুর: রংপুর অঞ্চলে এবার হাঁড়িভাঙা আমের দারুণ ফলন হতে চলেছে। অনুকূল আবহাওয়া আর সময়মতো ফুল আসায় পাঁচ জেলায় গাছগুলো এখন ফুলে ফুলে ভরে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ধারণা, এ মৌসুমে মোট উৎপাদন ৯৫ হাজার টনের বেশি হবে। আর এতে সবমিলিয়ে ২০০ কোটি টাকার ব্যবসার আশায় বুক বেঁধেছেন আম চাষিরা।
রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী– এই পাঁচ জেলায় হাঁড়িভাঙা আমের চাষ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। রংপুরের মিঠাপুকুর, বদরগঞ্জ ও পীরগঞ্জ উপজেলায় বড় বড় বাগান গড়ে উঠেছে। অনেক চাষি ৫ থেকে ১৫ একর জমিতে আম চাষ করেন, আবার অনেকে ঘরের আশেপাশে ১০-২৫টা গাছ লাগিয়ে সংসারের আয় বাড়ান।
মিঠাপুকুরের পদাগঞ্জ এলাকার চাষি মেহের আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘এবার ফুল ধরার অবস্থা অসাধারণ! গত ৬-৭ বছরে এমন দেখিনি। বাগানের যত্ন নিচ্ছি, আশা করছি ১৬ থেকে ২০ লাখ টাকা লাভ হবে।’ আরেক চাষি মিজানুর রহমান ১৭ একর জমিতে আম চাষ করেন। গতবার ১৫ লাখ টাকা লাভ হয়েছে, এবার আবহাওয়া ভালো থাকলে ২০ লাখের আশা করছেন। গোপালপুরের আকবরী আলীও উচ্ছ্বসিত; তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘১৮ বছর ধরে আম চাষ করে ভালোই আয় করছি। এখন সাত জন শ্রমিক দিয়ে ফুলের যত্ন নিচ্ছি।’
রংপুর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে জানান, বসন্তের শুরুতেই ফুল আসা শুরু হয়েছে। এখন ৯০ শতাংশ গাছে ফুল ধরেছে, প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ৯৫ শতাংশ শেষ হয়ে যাবে। এ মৌসুমে মোট সাড়ে সাত হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হবে, যার মধ্যে সাড়ে ছয় হাজার হেক্টরই হাঁড়িভাঙা। দীর্ঘ শীত ও কুয়াশা সত্ত্বেও ফুল আসার সময় ঠিক ছিল, এখন ফল ধরার আবহাওয়াও অনুকূল। আশা করা যাচ্ছে, এবার ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা করবেন আম চাষিরা।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, হাঁড়িভাঙা আম গাছের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ডালপালা ঊর্ধ্বমুখী বা আকাশচুম্বী হওয়ার চেয়ে পাশে বেশি বিস্তৃত হতে দেখা যায়। ফলে উচ্চতা কম হওয়ায় ঝড়-বাতাসে গাছ উপড়ে পড়ে না, আমও কম ঝরে পড়ে। মাঘ-ফাল্গুন মাসে এই আমের গাছে মুকুল আসে। পাকতে শুরু করে আষাঢ়ের প্রথম সপ্তাহ থেকেই।
আমটির উপরিভাগ বেশি মোটা ও চওড়া, নিচের অংশ অপেক্ষাকৃত চিকন। আমটি দেখতে সুঠাম ও মাংসালো, শ্বাস গোলাকার ও একটু লম্বা। আমের তুলনায় শ্বাস অনেক ছোট, ভেতরে আঁশ নেই। হাঁড়িভাঙা আম আকারের তুলনায় অন্য আমের চেয়ে ওজনে বেশি, গড়ে তিনটি আমে এক কেজি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি আম ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম পর্যন্ত ওজনের হয়ে থাকে। পুষ্ট আম বেশিদিন অটুট থাকে। চামড়া কুচকে গেলেও পচে না। ছোট থেকে পাকা পর্যন্ত একেক স্তরে এই আমের স্বাদ একেক রকম। তবে আমটি খুব বেশি না পাকানোই ভালো বলে পরামর্শ কৃষি বিভাগের।
হাঁড়িভাঙা আমের বিশেষত্ব অনেক। আঁশবিহীন, মাংসল, মিষ্টি, ছোট বিচি আর পাতলা খোসা–স্বাদে অতুলনীয়। এটি এখন রংপুরের জিআই (ভৌগোলিক সূচক) স্বীকৃত পণ্য। এই স্বীকৃতির কারণে দেশে-বিদেশে চাহিদা অনেক বেড়েছে। গত মৌসুমে জার্মানিতে প্রথমবারের মতো ২০০ কেজি রফতানি হয়েছে, আরও অর্ডার আসছে। মিঠাপুকুর থেকে শুরু হয়ে এখন রংপুরের সব উপজেলা ছাড়াও দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁওসহ আশপাশের জেলায় চাষ ছড়িয়েছে।
বুরিরহাট হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক ডা. আবু সায়েম সারাবাংলাকে বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা আম শত শত পরিবারের আর্থিক অবস্থা বদলে দিয়েছে।’ তিনি আরও জানান, এখানে হাঁড়িভাঙা ছাড়াও মোহনভোগ, বারি-৪, গোপালভোগ, ল্যাংড়া, ফজলি, খিরসাপাতি, চ্যাঁতাপুরি, লখনা, গৌরমতি, আম্রপালি, নাকফজলি প্রভৃতি জাতের আম চাষ হয়। তবে হাঁড়িভাঙাই সবচেয়ে জনপ্রিয়।
স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় হাঁড়িভাঙা আম গত এক দশক ধরেই রংপুরকে ব্র্যান্ডিং করে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে এই পণ্যটি ভৌগলিক নির্দেশক পণ্য তথা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে। সেই স্বীকৃতির পর তৃতীয়বারের মতো চলতি মৌসুমে হাঁড়িভাঙা আম বাজারে আসছে আর কিছুদিন পরেই।
এদিকে জাতীয়ভাবে পরিচিতি পাওয়ার পর এখন দেশের বাইরে হাঁড়িভাঙা আম রফতানির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই আমটি মূলত উত্তরের জেলা রংপুরে আবাদ হয়। রংপুরের মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ ইউনিয়নের পদাগঞ্জ এলাকায় এ আমের বাগান বেশি। বিশেষ করে এই পদাগঞ্জ এলাকার একসময়ের অনাবাদি জমিতে এখন গড়ে উঠেছে আমের বাগান।
স্থানীয়রা বলছেন, পদাগঞ্জ থেকে শুরু করে রংপুরের বিভিন্ন স্থানে হাঁড়িভাঙা আমের ফলন হচ্ছে প্রায় ৩০ বছর ধরে। কিন্তু এই আমের তেমন একটা পরিচিতি ছিল না। ২০১৫ সালে ঢাকায় ফল মেলা হলে সেখানে এই আম পরিচিতি পায়। এর অনন্য স্বাদ ও গন্ধ মানুষকে আকৃষ্ট করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে রংপুরের আম হিসেবে একনামে সারা দেশে পরিচিত হয় হাঁড়িভাঙা আম। সারাদেশেই তৈরি হয় এর কদর।
হাঁড়িভাঙার ইতিহাস
হাঁড়িভাঙা আমের গোড়াপত্তন করেছিলেন খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানি গ্রামের নফল উদ্দিন পাইকার নামে এক ব্যক্তি। নফল উদ্দিন পাইকারের ছেলে আমজাদ হোসেন সারাবাংলার এই প্রতিবেদকে জানান, ১৯৪৯ সাল, তখন তার বাবা নফল উদ্দিন একটি গাছটি রোপণ করেছিলেন। একটি জমি থেকে দু’টি আমের চারা নিয়ে এসে কলম করেন তার বাবা। তবে একটি গাছ চুরি হয়ে যায়। বাকি গাছটিতে মাটির হাঁড়ি বেঁধে পানি (ফিল্টার সিস্টেমে) দেওয়া হতো। একদিন রাতে কে বা কারা মাটির হাঁড়িটি ভেঙে ফেলে। সেদিন থেকেই গাছটির নাম হাঁড়িভাঙা আম গাছ।
তিনি আরও জানান, গাছটিতে এক সময় বিপুল পরিমাণ আম ধরে। খেতে খুবই সুস্বাদু। বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে গেলে লোকজন এই আম সম্পর্কে জানতে চায়। তখন থেকেই গাছটি হাঁড়িভাঙা নামে পরিচিতি পায়। এখন হাঁড়িভাঙা আমের সুনাম মানুষের মুখে মুখে। গড়ে উঠেছে হাজার হাজার বাগান। তিনি হাঁড়িভাঙা আমের মাতৃগাছটির সংরক্ষণের দাবি জানান।
চাষিদের প্রতি পরামর্শ দিয়ে রংপুর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে জানান, ফুল ধরার সময় গাছের ভালো যত্ন নিতে হবে, ঘাসফড়িংসহ পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আগামী মাস থেকে তাপমাত্রার ওঠানামা, বৃষ্টি আর পোকার আক্রমণ সহনশীল সীমার মধ্যে থাকলে উন্নতমানের বাম্পার ফলন নিশ্চিত।
হাঁড়িভাঙা আম বাজারে আসবে জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাই পর্যন্ত। এবারও চাষিরা ভালো দাম পাবেন বলে আশা করছেন। রংপুরের এই সুস্বাদু আম এখন শুধু দেশের বাজারেই নয়, বিদেশেও সুনাম কুড়োচ্ছে। আমজাদ নামে এক চাষি বলছেন– ‘যত্ন নিলে লাভও বেশি!’।