Tuesday 17 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জুলাই হত্যা মামলা থেকে নাম কাটাতে চলছে ‘হলফনামা বাণিজ্য’

রাব্বী হাসান সবুজ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৭ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৭

রংপুরে জুলাই হত্যা মামলার আসামিরা।

রংপুর: জুলাই বিপ্লবের পর রংপুরে ছয়জন হত্যার ঘটনায় ৭টি হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও হামলার ঘটনায় দায়ের করা ৩৬টি মামলা থেকে নিজেদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য তৎকালীন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক স্পিকার, মন্ত্রী ও এমপিসহ শীর্ষ নেতারা হলফনামা (এফিডেভিট) জমা দিয়ে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ‘নাম কর্তনের’ চেষ্টা চালাচ্ছেন।

‘হলফনামা বাণিজ্যের’ বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আইন বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন-তদন্তাধীন হত্যা মামলায় এ ধরনের হলফনামার কোনো আইনি গুরুত্ব নেই; শুধু তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনই চূড়ান্ত। এদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা এখন চোখ রাখছে তদন্ত সংস্থা ও আদালতের দিকে-যাতে জুলাইয়ের রক্ত বৃথা না যায়।

বিজ্ঞাপন

আদালত সূত্রে জানা গেছে, রংপুর মহানগরে ও জেলায় জুলাই আন্দোলনের পরে সময় আবু সাঈদসহ ৬ জন হত্যার ঘটনায় ৭টি হত্যা, ১৩টি হত্যাচেষ্টা ও হামলার মামলায় মোট ৩৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি তালিকায় রয়েছেন সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান খান, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীসহ বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, মহানগর পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলা পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতারা। অভিযোগ উঠেছে, বাদীদের প্রভাবিত করে মোটা টাকার বিনিময়ে এফিডেভিটের মাধ্যমে নাম বাদ দেয়ার আবেদন জমা দেওয়া হচ্ছে।

জুলাই হত্যা মামলার আসামি।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ১৯ জুলাই রংপুর সিটি বাজার এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলিতে নিহত হন স্বর্ণশ্রমিক মুসলিম উদ্দিন মিলন। মিলন রংপুর নগরীর পূর্ব গণেশপুর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন এবং দেওয়ানবাড়ী সড়কের একটি জুয়েলার্সে কর্মরত ছিলেন। মিলনের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার বাদী হয়ে ওই বছরের ২৭ আগস্ট হত্যা মামলা দায়ের করেন, সেই মামলায় সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী টিপু মুন্সি, আইনজীবী নেতা আব্দুল হক প্রামাণিকসহ ১৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

দিলরুবা আক্তার বলেন, ‘আমরা ভুক্তভোগী পরিবার এখন শুধু তদন্ত সংস্থা ও আদালতের ভরসায় আছি যাতে জুলাইয়ের রক্ত বৃথা না যায়।’

শুধু হলফনাম নয়, সম্প্রতি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা জুলাই আন্দোলনে নিহত মাহমুদুল ইসলাম মুন্নার মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করলে বাদীকে এক ঘন্টা এজলাসে রাখেন বিচারক। এ ছাড়া আবু সাঈদসহ অন্যান্য হত্যা মামলায়ও একই কৌশলের অভিযোগ উঠেছে।

তবে হলফনামা বাণিজ্যের বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত। এবিষয়ে মহানগর জামায়াতের আমির এটিএম আজম খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যারা প্রকৃত দোষী, তাদেরকে এফিডেভিটের মাধ্যমে বাঁচানোর চেষ্টা করা গাদ্দারি।’

আর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা সাংগঠনিকভাবে রংপুরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে নামব। এমন ঘটনা কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

আইনের দৃষ্টিতে হলফনামা অকার্যকর উল্লেখ করে রংপুর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আফতাব হোসেন জানান, ‘প্রভাবশালী মহল বাদীদের প্রভাবিত করে এফিডেভিট জমা দিচ্ছে—আমরা বিষয়টি অবগত।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্যানেল আইনজীবী রায়হানুল কবির বলেন, ‘তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি অপরাধী শনাক্ত করেন, তাহলে চার্জশিটে নাম আসবেই। হলফনামা এখানে কোনো কাজে আসবে না।’

মহানগর পুলিশ কমিশনার মজিদ আলী স্পষ্ট জানান, ‘আপোষযোগ্য নয় এমন মামলায় এফিডেভিট গ্রহণযোগ্য নয়। তদন্ত চলাকালীন এটি প্রযোজ্যই নয়।’

সিআইডির রংপুরের বিশেষ পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী বলেন, ‘কে এফিডেভিট দিয়েছে তা আমার তদন্তের বিষয় নয়। তদন্তে যার নাম আসবে, তাকেই চার্জশিটে রাখব।’

রেঞ্জ ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্তে নাম এলে কাউকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।’

আদালত সূত্র জানায়, চারটি হত্যা মামলা তদন্ত করছে সিআইডির রংপুর শাখা, বাকিগুলো মহানগর-জেলা পুলিশ ও পিবিআই। ৭টি হত্যা ও ১৩টি হত্যাচেষ্টা মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা এখন হলফনামার পথ বেছে নিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে রংপুরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে আবু সাঈদসহ অন্তত ৬ জন নিহত হন। সরকার পতনের পর এসব ঘটনায় ৩৬টি মামলা হয়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে প্রভাবশালী আসামিরা বাদীদের সঙ্গে অর্থ লেনদেন করে হলফনামা সংগ্রহ করছেন।

বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা বলছেন, এটি বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার ষড়যন্ত্র। তবে পুলিশ ও আইনজ্ঞরা একমত-তদন্তের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত চার্জশিট জমা পড়বে। শহীদ পরিবার ও আন্দোলনকারীরা আশঙ্কা করছেন, এই কৌশলে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর