রংপুর: রংপুর অঞ্চলের হাজার হাজার আলুচাষির মনে এবার ঈদের আনন্দ মেলেনি। বাজারে আলুর দাম তলানিতে ঠেকায়, এক কেজি বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ উঠছে না। কোথাও কোথাও মাত্র ৫ থেকে ৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে আলু, যেখানে খরচ ১৪ থেকে ১৬ টাকা বা তারও বেশি। তার ওপর হঠাৎ অকাল ঝোড়ো হাওয়া ও ভারি বৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ খেত তলিয়ে গেছে, পচনের আতঙ্কে দিশেহারা চাষিরা। ফলে পরিবারের কারও জন্য নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য নেই। ঈদের আনন্দ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে শুধু আনুষ্ঠানিকতায়। ‘আলু চাষ করে বিপদ, না করেও বিপদ’— এই আর্তনাদে ভরে উঠেছে উত্তরের মাঠ-ঘাট।
গত বছরের লোকসান কাটিয়ে এবার বুকভরা আশা নিয়ে চাষ করেছিলেন চাষিরা। ফলন বাম্পার হলেও দাম না পাওয়া আর প্রকৃতির বৈরিতায় স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ঈদের এই সময়ে তাদের চোখের জল মুছিয়ে দিতে সরকারি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। না হলে প্রতি বছরই এই লোকসানের চক্র চলতে থাকবে— যা শুধু চাষিদের নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

আলু খেত।
সম্প্রতি রংপুর, পীরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, মিঠাপুকুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শত শত একর আলুক্ষেত পানিতে ডুবে আছে। গত কয়েক দিনে ৪৪ থেকে ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী ৪-৫ দিন থেমে-থেমে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে মাঠে তোলা বা খেতে থাকা আলুতে পচন ধরার তীব্র শঙ্কা। অনেক চাষি বাধ্য হয়ে খেত থেকেই ৪-৬ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করে দিচ্ছেন।
চাষিদের বুকফাটা যন্ত্রণা
পীরগঞ্জের কৃষক আইয়ুব আলী, মোস্তফা মিয়া ও আনিছার রহমান বলেন, ‘বেশি দামে বীজ কিনে আবাদ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু দাম নেই। বৃষ্টিতে সব তলিয়ে গেল। এবার ঈদে ছেলে-মেয়েদের নতুন জামা কিনতে পারিনি।’
তারাগঞ্জের ফকিরপাড়ার নুর আলম আক্ষেপ করে বলেন, ‘এক মণ আলু বেচে একটা পোশাকও হয় না। গত বছর ২ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এবারও একই অবস্থা। পরিবারের মুখে হাসি নেই।’
গঙ্গাচড়ার মিজানুর রহমান জানান, ‘১২ বিঘায় চাষ করেছি। দাম কম তো ছিলই, তার ওপর বৃষ্টিতে খেত ডুবে গেছে। পানি সরানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু কতটুকু বাঁচবে কে জানে।’
কাউনিয়া ও আমাশু কুকরুলের চাষি মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ‘২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ। সার-বীজের দাম বেড়েছে, ধারদেনা করে চাষ। এখন দাম ৮-১০ টাকা, বৃষ্টির পর আরও কমবে। সিন্ডিকেট ও কালোবাজারির চাপ তো আছেই।’

বৃষ্টিতে আলু খেতে কাদা।
রামনাথপুর ও পোদ্দারপাড়ার চাষিরা জানান, প্রতি মণে ২০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। হিমাগারে জায়গা নেই, খরচও বেশি। ফলে খেতেই আলু ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
ইকরচালী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মিলন রহমান বলেন, ‘পাঁচ একর ডুবে গেছে। শ্রমিকরা পানি সরাতে পারছে না। দাম নেই, তার ওপর এই অবস্থা— চাষিদের মরণ ছাড়া গতি নেই।’
উৎপাদন ও সংরক্ষণ সংকট
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুসারে, রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় এবার প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮৫ হেক্টরে আলু চাষ হয়েছে, উৎপাদন প্রায় ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার টন। রংপুর জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ৫৪ হাজার ৫০ হেক্টর (গত বছর ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর)—আবাদ কমেছে। পাঁচ জেলা (রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী) মিলে গত বছর ১ লাখ ১৯ হাজার হেক্টর থেকে এবার কমে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার হেক্টরে নেমেছে। প্রায় ৭৫-৮০ হাজার চাষি জড়িত, ৭৫ শতাংশ আলু উত্তোলিত।
বিভাগের ১১৬টি হিমাগারে সংরক্ষণ সক্ষমতা মাত্র ১১ লাখ ৯ হাজার টন। পীরগঞ্জে উৎপাদন ১ লাখ ৮০ হাজার টনের বেশি, কিন্তু ৪টি হিমাগারে ধারণক্ষমতা ৫২ হাজার ৫০০ টন। ফলে অর্ধেকের বেশি আলু খোলা রাখতে হয়েছে। হিমাগারে রাখা আলুতেই প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার লোকসানের আশঙ্কা। গত মৌসুমে দেশে রেকর্ড ১ কোটি ১৫ লাখ টন উৎপাদন হয়েছে, চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি—যা দাম ধসের অন্যতম কারণ।

খেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আলু পঁচে যাচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও চাষিদের দাবি
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় বড় ক্ষতির আশঙ্কা কম। চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে দ্রুত পরিপক্ব আলু তুলে নিতে। ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে আলু রফতানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে স্থগিত রফতানি শুরু হলে দাম বাড়বে।’
বাংলাদেশ খেতমজুর ও কৃষক সংগঠনের রংপুর জেলা আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন বাবলু বলেন, “আলু কেজিপ্রতি ৩-৪ টাকায় নেমেছে বলেও শোনা যাচ্ছে। সারের সংকট-দাম বৃদ্ধি, সিন্ডিকেট চলছে। আলু দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল, বিশ্বব্যাপী চাহিদা আছে। সরকারের উচিত ন্যায্য লাভজনক দাম নিশ্চিত করা, ভর্তুকি মূল্যে সার দেওয়া, কালোবাজারি বন্ধ করা এবং হিমাগার সক্ষমতা বাড়ানো।”