ঠাকুরগাঁও: ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ। প্রায় আড়াইশ বছরের প্রাচীন এই স্থাপত্য নিদর্শনটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের তালিকাভুক্ত হলেও দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণের অভাবে অবহেলায় পড়ে আছে।
জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই মসজিদটি নির্মাণশৈলী ও কারুকাজের অনন্য সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। ১৭৮০ সালে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হতে সময় লেগেছে প্রায় ২১ বছর। ২০০৬ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, তৎকালীন জমিদার আব্দুল হালিম চৌধুরী বসন্তনগর এলাকায় বসতি স্থাপন করে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তার বংশধরদের হাত ধরে মসজিদটির নির্মাণ কাজ এগিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৮০১ সালের দিকে জমিদার জামাল উদ্দীন চৌধুরীর উত্তরসূরি নুনু মোহাম্মদ চৌধুরী মসজিদটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। ৪ প্রজন্মের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই স্থাপনাটিই আজকের জামালপুর জামে মসজিদ।
স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যে মসজিদটি ব্যতিক্রমী। এতে রয়েছে বড় আকৃতির ৩টি গম্বুজ এবং ২৪টি মিনার, যা বাংলাদেশের অন্য কোনো মসজিদে সচরাচর দেখা যায় না। প্রতিটি মিনার প্রায় ৩৫ ফুট উঁচু এবং দৃষ্টিনন্দন নকশায় সজ্জিত। মসজিদের ভেতর ও বাইরের দেয়ালে লতাপাতা ও ফুলের সূক্ষ্ম কারুকাজ মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের। প্রায় ৩০০ মুসল্লি একসঙ্গে এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৬৫ সালের দিকে ঝড়-বৃষ্টিতে ১১টি মিনার ভেঙে যায়। এর মধ্যে কয়েকটি সংস্কার করা হলেও এখনও ৪টি মিনার ভাঙা অবস্থায় রয়েছে।
মসজিদটি দেখতে আসা দর্শনার্থীরা এর নান্দনিকতা দেখে মুগ্ধ হলেও সংরক্ষণের অভাবে হতাশা প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, যথাযথ সংরক্ষণ করা হলে এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
দর্শনার্থী সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মসজিদটি দেখে অভিভূত হলাম। এটি অতি পুরাতন একটি মসজিদ, তাই এটি সংরক্ষণ করা জরুরি। সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নিলে এটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে।’
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা নূরুল আনোয়ার চৌধুরী বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর প্রায় ২ দশক আগে দায়িত্ব নিলেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এতে ধীরে ধীরে ক্ষয় হচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি।
মসজিদের ইমাম হাফেজ মো. রুহুল আমীন জানান, ‘মসজিদটি দেখতে শুধু বাংলাদেশ থেকে নয় দেশের বাইরে থেকেও অনেক মানুষ আসেন। প্রতিদিন শত শত মানুষের সমাগম হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ না থাকায় এর স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।’ স্থানীয় প্রশাসন ও সরকাররের প্রতি মসজিদটি সংরক্ষণের দাবি জানান তিনি।
স্থানীয়রা জানান, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও নান্দনিকতার অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ আজও সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে। তবে যথাযথ সংরক্ষণ না হলে এই মূল্যবান স্থাপনাটি ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যেতে পারে।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ইরশাত ফারজানা বলেন, জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদটি সংস্কারের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর মসজিদটি সংস্কারের ব্যবস্থা নিলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।