Tuesday 05 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রোহিঙ্গাদের জন্য পাহাড় কেটে দোতলা ঘর, স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৫ মে ২০২৬ ১৪:২৭ | আপডেট: ৫ মে ২০২৬ ১৬:৫৯

রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মাণাধীন ঘর বা আশ্রয়কেন্দ্র।

কক্সবাজার: কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় কেটে ইট ও লোহার কাঠামোয় ৮৮৮টি শেল্টার নির্মাণের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, এগুলো স্থায়ী অবকাঠামো নয়। নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে এগুলো গড়ে তোলা হচ্ছে।

তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, এই নির্মাণ কার্যক্রম রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করছে এবং পরিবেশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুতুপালং ক্যাম্পের ৪ নম্বর এক্সটেনশনের ‘ই’ ব্লকে পাহাড় কেটে প্রায় ১০ ফুট প্রশস্ত সড়ক তৈরি করা হয়েছে। আশপাশের টিলাও কেটে সমতল করা হচ্ছে। সেখানে ইট, বালু ও লোহা ব্যবহার করে শত-শত শেল্টার নির্মাণ চলছে। এরইমধ্যে ৮৮৮টি ঘরের কাজ এগিয়ে গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

বিজ্ঞাপন

নির্মাণকাজের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর উখিয়া-টেকনাফজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির মহাসচিব এবং পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় ১৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গার চাপের মধ্যেই স্থানীয়রা বিপর্যস্ত। সেখানে এ ধরনের শক্ত অবকাঠামো নির্মাণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

তিনি অভিযোগ করেন, ইউএনএইচসিআর-এর সহযোগিতায় কিছু এনজিও রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরি করছে। তার দাবি, ‘সওয়াব’ নামের একটি এনজিও ইউএনএইচসিআরের অর্থায়নে দোতলা কাঠামো নির্মাণে যুক্ত।

গফুর উদ্দিন আরও বলেন, ‘পাহাড় কেটে স্থায়ী ঘর নির্মাণ করা হলে তা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করবে।’

উখিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাধারণত বাঁশ ও ত্রিপলের অস্থায়ী ঘর হয়। এখন ইট-লোহার ব্যবহার স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কক্সবাজার জেলা আমির মাওলানা নূর আহমেদ আনোয়ারীও দ্রুত এই নির্মাণকাজ বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

রাজাপালং ইউনিয়নের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘বর্ষার আগে পাহাড় কাটার কারণে ভূমিধসের বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’

পরিবেশবিদদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের পর থেকেই কক্সবাজারের বনভূমির ওপর চাপ বেড়েছে।

কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, ‘এরইমধ্যে দক্ষিণ বন বিভাগের বিশাল বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। এশীয় হাতির আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন করে আবাসন নির্মাণ পরিবেশের জন্য বড় হুমকি।’

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া ও টেকনাফে অন্তত ৮ হাজার একরের বেশি বনভূমি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।

কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘নির্মাণাধীন এসব শেল্টার কোনো স্থায়ী কাঠামো নয়। ঝুঁকিপূর্ণ ঘরে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের জন্য এগুলো তৈরি করা হচ্ছে।’

তিনি জানান, পাহাড় কাটার অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ইউএনএইচসিআর-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শেল্টারগুলো এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে ঝড়-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। তবে এগুলো সহজেই খুলে ফেলা সম্ভব। স্টিল পাইপ নাট-বল্টুর মাধ্যমে সংযুক্ত হওয়ায় এগুলো স্থায়ী অবকাঠামো নয়।

স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ২০২৫ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ক্যাম্প সফরের সময় ‘মানবিক করিডর’ নিয়ে আলোচনার আড়ালে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমান নির্মাণকাজ সেই পরিকল্পনার অংশ বলে তাদের ধারণা।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘টেকসই শেল্টার’ নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের যুক্তি, অন্যদিকে স্থায়ী বসবাসের আশঙ্কা ও পরিবেশগত বিপদের সতর্কতা। তদন্তের ফলাফল এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, এই বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়।’

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান ও সহিংসতার মুখে লাখো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে কক্সবাজার, উখিয়া ও ভাসানচরের ৩৪টি ক্যাম্পে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর