নওগাঁ: নাগর নদের শান্ত জলরেখা, কুঠিবাড়ির প্রাচীন দেয়াল, সবুজে ঘেরা জনপদ আর গ্রামীণ নিসর্গ—সব মিলিয়ে ফের উৎসবে মুখর হয়ে উঠেছে কবিগুরুর স্মৃতিধন্য পতিসর। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার পতিসরে শুরু হচ্ছে বর্ণাঢ্য জাতীয় আয়োজন। কবির স্মৃতিবিজড়িত কাছারিবাড়ি ও কুঠিবাড়ি ঘিরে এখন উৎসবের আমেজ। জাতীয় পর্যায়ের এই আয়োজনকে ঘিরে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে প্রাণবন্ত পরিবেশ।
২৫ বৈশাখ। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অবিস্মরণীয় মহীরুহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও মানবতাবাদী চিন্তার আলো আজও বাঙালির হৃদয়ে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সেই মহাকবির জন্মজয়ন্তী এবারও বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হচ্ছে তার স্মৃতিধন্য পতিসরে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পতিসরের কাছারিবাড়ি প্রাঙ্গণ, দেবেন্দ্র মঞ্চ ও আশপাশের এলাকাজুড়ে সাজসজ্জার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রবেশপথে তৈরি করা হয়েছে নান্দনিক তোরণ। বিভিন্ন স্থানে টানানো হয়েছে কবিগুরুর ছবি, বাণী ও আলোকসজ্জা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের জন্যও রাখা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থাপনা।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এবং নওগাঁ জেলা প্রশাসনের বাস্তবায়নে দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত ও রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হবে। পরে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাট্য পরিবেশনা ও রবীন্দ্রমেলা। একইসঙ্গে পতিসর কলেজ মাঠে শুরু হচ্ছে ১০ দিনব্যাপী রবীন্দ্রমেলা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু এমপি, সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি এবং জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। সভাপতিত্ব করবেন রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম. বজলুর রশীদ। উপদেষ্টা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) আসনের সংসদ সদস্য এসএম রেজাউল ইসলাম রেজু।
এছাড়া নওগাঁর সকল সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলাম, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা, কবি-সাহিত্যিক, গবেষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও আমন্ত্রিত অতিথিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের রবীন্দ্র ও নজরুলসংগীত শিল্পী ড. হারুন অর রশীদ।
রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। গ্রামীণ জনপদজুড়ে এখন উৎসবের আবহ। ছোট-বড় নানা বয়সী মানুষের মুখে মুখে রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা ও স্মৃতিচারণ।
উল্লেখ্য, পতিসরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক শুধু জমিদারির প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এ জনপদ তার সাহিত্যজীবনেরও এক উর্বর ক্ষেত্র। ১৮৯১ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো তিনি পতিসরে আসেন পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত কালীগ্রাম পরগনার জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে। এরপর দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিয়মিত এখানে আসা-যাওয়া করেছেন।
নাগর নদ তীরের এই নিভৃত পল্লীজীবন তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এখানকার কৃষক, প্রজা, প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ তার সাহিত্য ও চিন্তাকে সমৃদ্ধ করেছে। পতিসরে অবস্থানকালে তিনি বহু বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম রচনা করেন। তার কবিতা, গান, চিঠিপত্র ও গল্পে গ্রামীণ বাংলার যে মানবিক রূপ ফুটে উঠেছে, তার বড় একটি অংশের অনুপ্রেরণা এসেছে এই পতিসর থেকেই।
কবিগুরু সর্বশেষ পতিসরে আসেন ১৯৩৭ সালের ২৭ জুলাই। এরপর ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট (২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) তিনি পরলোকগমন করেন। তবে তার স্মৃতি, দর্শন ও সাহিত্যকীর্তি আজও জীবন্ত হয়ে আছে পতিসরের মাটিতে।